Gmail! | Yahoo! | Facbook

বাজেট পুরোটাই ব্যবসাবান্ধবঃ অর্থমন্ত্রী

FacebookTwitterGoogle+Share

finance ministerঢাকা, ৫ জুন ২০২১ঃ প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক বেশি কর ছাড় দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘করহার আস্তে আস্তে কমালেই কর সংগ্রহ বাড়বে। আর বাজেট পুরোটাই ব্যবসাবান্ধব। মানুষের চাহিদার পরিবর্তন হয়। চাহিদা পূরণে ব্যবসায়ীদেরও পরিবর্তন আসে। সারা বিশ্ব কী করছে, সেটাও দেখতে হবে। উন্নত বিশ্ব যদি পিছিয়ে পড়ে, তাহলে আমরা এগোতে পারব না। কারণ, উন্নত বিশ্বেরও আমাদের দরকার। আজ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিই আমাদের শেখায় যে আমরা একে অপরের সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত।’

আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট-উত্তর ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে গতকাল শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেছেন। কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনকে নিয়ে প্রশ্নোত্তরনির্ভর এই সংবাদ সম্মেলন করেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী এ সময় বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের প্রতি আমরা ওয়াদাবদ্ধ। ফলে তাঁরা সুযোগ নেবেন। সুযোগ নেওয়া মানে হচ্ছে উৎপাদনে যাওয়া। তাঁরা উৎপাদনে গেলেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। “মেড ইন বাংলাদেশ” ট্যাগলাইনটা ব্যবহার করতে শুরু করেছি। সময়োপযোগী পদক্ষেপ এটা। যেখানেই সম্ভাবনা ও সক্ষমতা আছে, সবটুকু কাজে লাগানো হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে ভ্যাট-কর কমিয়ে দেশীয় শিল্পকে আরও সুরক্ষা দেওয়া হবে। ভ্যাট-কর আর বাড়ানো হবে না। কমানো হবে আরও বেশি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য।’

ঢালাও সুযোগের সিদ্ধান্ত এক মাস পর

কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ নিয়ে বৃহস্পতিবারের বাজেট বক্তব্যে কিছুই বলেননি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে গতকাল প্রশ্ন করে তাঁর কাছ থেকে জবাব পাওয়া গেল, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত যে ঢালাও সুযোগটি ছিল, এর সময়সীমা নতুন করে আর বাড়াচ্ছেন না তিনি।

অর্থমন্ত্রী এর কারণও ব্যাখ্যা করেন। প্রথমেই তিনি বলেন, এটা কালোটাকা নয়, বরং অপ্রদর্শিত আয়। কালোটাকা ও অপ্রদর্শিত আয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। অপ্রদর্শিত আয় হয় পদ্ধতিগত সমস্যার কারণে। তাঁর মতে, নতুন করে সুযোগটি না রাখার কারণ হচ্ছে এতে খুব একটা লাভ হয়নি। তা ছাড়া এ ব্যাপারে মিশ্র অভিমত আছে। কেউ বলেন এটা ভালো, কেউ বলেন খারাপ।

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে গত ১৯ মে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, যত দিন অপ্রদর্শিত আয় থাকবে, তত দিন তা সাদা করার সুযোগ থাকবে। বিষয়টি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রীর কাছে গতকাল জানতে চাওয়া হয়, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কারণ কী।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যখন বলেছিলাম, তখন পর্যন্ত আমার কাছে যথাযথ তথ্য ছিল না। লাভজনক হলে চেষ্টা করে দেখব অব্যাহত রাখা যায় কি না। অনেকে বলছেন, এটি অব্যাহত থাকলে সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। আরও এক মাস দেখব। তারপর সিদ্ধান্ত হবে।’

কোনো ঘোষণায় (সিস্টেমে) না থাকা টাকা ব্যবহার করা যায় না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ টাকাটা প্রদর্শিত আয় হয়ে ঘুরে এলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়। কালোটাকা সৃষ্টি হয় দুর্নীতির মাধ্যমে আর অপ্রদর্শিত আয় সৃষ্টি হয় পদ্ধতিগত সমস্যার কারণে। দেখা গেল, করহার করে রাখা আছে ৫০, ৫৫ বা ৬০ শতাংশ। এটা অন্যায়। এ দেশের মানুষের সঙ্গে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনেক অন্যায় করা হয়েছে। একটা সময় ছিল অনেক বেশি আয়কর নেওয়া হতো। বলা হতো যাঁরা বেশি আয় করবেন, তাঁদের আরও বেশি কর দিতে হবে। অথচ উল্টোটা হওয়ার কথা ছিল।

আয়কর অধ্যাদেশের ১৯ ধারা অনুযায়ী অবশ্য এলাকাভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে কালোটাকা সাদা করার সুযোগটি রয়ে গেছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিল্প খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগও থাকছে। আর নির্ধারিত করের পাশাপাশি ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে ঘোষণায় আনার সুযোগ তো আছেই।

টিকা দেওয়ার সময় ব্যাখ্যাহীন

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালের কাছে সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, বাজেট বক্তব্যে তিনি যে বললেন প্রতি মাসে ২৫ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হবে। এভাবে দিতে গেলে তো চার বছর লেগে যাবে।

প্রশ্ন শুনে অর্থমন্ত্রী প্রথমেই বলেন, ‘কোথায় পেলেন এ তথ্য?’ জবাবে সাংবাদিক বলেন, ‘আপনার বাজেট বক্তব্যেই তা বলা আছে।’

বাজেট বক্তব্যের ৪৫ পৃষ্ঠায় গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘মোট ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার আওতায় আনার জন্য ভাগ ভাগ করে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগণকে টিকা দেওয়া হবে এবং প্রতি মাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়া হবে।’

অর্থমন্ত্রী এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি। শুধু বলেন, ‘শুরুর দিকে মাইকিং করেও টিকা দেওয়ার লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে সবাইকেই টিকার আওতায় আনা হবে। এ জন্য অর্থেরও ব্যবস্থা করেছি। আমরা প্রস্তুত। সময় বেঁধে দিয়ে সেটা নয়।’

অর্থমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে স্বাস্থ্য খাত ও টিকাবিষয়ক প্রশ্নের জবাব দেন অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদারও। তিনি বলেন, এক বছরের টিকা দেওয়ার টাকা বরাদ্দ আছে সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রয়োজনে অন্য খাত থেকেও টাকা নেওয়া যাবে।

স্বাস্থ্য খাতের এবারের বাজেট ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য রাখা হচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থসচিব বলেন, বরাদ্দ নিয়ে সমস্যা নেই, সমস্যা ব্যয় সক্ষমতার। কেনাকাটায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের। কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনতে বিকল্প উপায় ভাবা হচ্ছে।

কর্মসংস্থান একার পক্ষে সম্ভব নয়

কর্মহীন হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে নতুন বাজেটে স্পষ্ট কিছু নেই বলে সমালোচনা রয়েছে। এমনকি মহামারির কারণে নতুন করে যাঁরা গরিব হয়েছেন বা কাজ হারিয়েছেন, তাঁদের জন্যও স্পষ্ট কিছু নেই বাজেট প্রস্তাবে। এ জন্য একধরনের সমালোচনা রয়েছে।

এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের একার পক্ষে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতকেও এই দায়িত্ব নিতে হবে। তারা যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সে জন্যই প্রস্তাবিত বাজেটে সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাতকে চালকের আসনে (ড্রাইভিং সিট) বসাতে হবে। তাহলেই তারা এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারা যেন সেটা করতে পারে, সে জন্য সরকার সহযোগিতা করবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ইতিবাচক ধারায় চলছে। যে যা–ই বলুন না কেন, আমাদের অবস্থান শুধু এশিয়ায় নয়, গোটা বিশ্বেই আলোচ্য বিষয়। জিডিপির তুলনায় ঋণ আমাদের এখনো ৪০ শতাংশের নিচে আছে। অথচ চীনের তা ১০০ শতাংশের মতো। ভারতেরও প্রায় একই অবস্থা।

অর্থনীতির ৮০ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বিনিয়োগ এখন ৩১ শতাংশে আছে বলে তথ্য দেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম। তিনি বলেন, বেসরকারি খাত চালকের আসনে থাকলে অর্থনীতির উজ্জীবন হবে। বাজেটটি সেভাবেই প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি অনেক বড় হয়েছে এবং ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যও যে অনেক বেশি তা শেষ পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব হবে কি না—এই প্রশ্নের জবাব দিতে অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘সংশয় থাকার কোনো কারণ নেই। অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী।’

বাজেট বক্তব্যে প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে তেমন কিছু বলা নেই—এ বিষয়ে অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোর কার্যক্রম চলবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে দিয়েছেন, দরকার হলে আরও প্যাকেজ আসবে। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বছরে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

যেসব প্রশ্নের জবাব মেলেনি

ব্যতিক্রম একটি ছাড়া এক যুগ ধরেই সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) খাতের বরাদ্দ কাজে লাগছে না। এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে কেন—এই প্রশ্নের জবাব দেননি কেউই।

দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা হওয়া সত্ত্বেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ও মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর একশ্রেণির লোক যে দুর্নীতি করছেন বলে উঠে আসে, তা প্রতিরোধের কোনো পদক্ষেপের কথাও নেই অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে। কেন নেই? এই প্রশ্নের জবাব অর্থমন্ত্রী নিজেও দেননি, অন্য কাউকেও দিতে বলেননি।

অর্থমন্ত্রীর কাছে আরও প্রশ্ন ছিল, গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে বাজেট বক্তব্যে তিনি কিছু বলেননি কেন? তিনি কি ভুলে গিয়েছিলেন নাকি এড়িয়ে গেলেন? জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেট বক্তব্যে তিনি সব আনতে পারেননি। তার মানে এই নয়, এ খাতের হিসাব বাইরে চলে গেছে। এ বিষয়েও অর্থসচিবকে জবাব দিতে বলেন মুস্তফা কামাল। অর্থসচিব বলেন, প্রতিরক্ষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত। এবারের বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ বেড়েছে ৮ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান খুলনা অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব রয়েছে বলে জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির কোন প্যাকেজ থেকে কত টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার ফিরিস্তি দেন। এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম সুযোগ পেলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম ও ইআরডি সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সুযোগ পাননি। প্রথম আলো

মন্তব্য