Gmail! | Yahoo! | Facbook

বাংলাদেশকে কেউ ধাবিয়ে রাখতে পারবে নাঃ পদ্মাসেতুর নাম ফলক উন্মোচনের পর প্রধানমন্ত্রী

FacebookTwitterGoogle+Share

pmঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০১৮ঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালিদের দাবিয়ে রাখা যাবে না। ড. মুহম্মদ ইউনুসের প্ররোচণায় বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু নির্মাণের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। ড. ইউনুস বেআইনিভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদে ছিলেন। তাকে বলার পরও তিনি সরলেন না। উপদেষ্টার প্রস্তাব প্রত্যাখান করে উল্টো সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করলেন। মামলায় হেরে আমেরিকায় যান। সেখানে তার প্ররোচণায় তখনকার বিশ্বব্যাংক প্রধান এ প্রকল্পের অর্থ বন্ধে অর্ডার দিয়ে যান। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে দেশি-বিদেশি অনেক হুমকি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্রও মোকাবেলা করতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে যেমন বলেছেন, দাবিয়ে রাখা যাবে না। বাঙালিদের দাবিয়ে রাখা যায়নি। বাংলাদেশকে কেউ ধাবিয়ে রাখতে পারবে না। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু আজ বাস্তায়নের পথে।
মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে রবিবার পদ্মাসেতুর নাম ফলক উন্মোচনের পর এক সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এ সব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের আইনে আছে, ৬০ বছর পর্যন্ত ব্যাংকের এমডি থাকতে পারবেন। কিন্তু ড. ইউনুস কোনো অনুমোদন ছাড়াই ৭০ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ বছর বেশি এমডির পদে থাকেন। সব সুযোগ সুবিধাও ভোগ করেন। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী- এই দুইজন ড. ইউনুসের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাকে বলা হয়, আপনি ব্যাংকের এমিরেটাস অ্যাডভাইজার হিসেবে থাকেন।’ কিন্তু তিনি আমাদের কথা শুনলেন না। তিনি দুটি মামলা করলেন। কোর্ট তাকে বললো, আপনার এমডি থাকা আইন অনুমোদন করে না। আপনি এ পদে থাকতে পারবেন না।’
তিনি বলেন, ওই সময় হিলারি ক্লিটন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আমায় ফোন করলেন। টনি ব্লেয়ার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার স্ত্রী শেরি ব্লেয়ারও আমাকে ফোন করলেন। আমি তাদের বললাম- এটা তো আইনে পড়ে না। আমরা তাকে সম্মানজনক প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি রাখলেন না। এটা কোর্টের বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে কিছু বলাও হয়নি। তিনিই মামলা করে হেরেছেন।
‘আমাকে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে ইউনুসকে সরালে পদ্মাসেতু হবে না। নোবেল পেয়ে গেছেন কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদের লোভ ছাড়তে পারেন না তিনি। এরপর একটি পত্রিকার সম্পাদক ও ইউনূস আমেরিকায় যান এবং হিলারি ক্লিনটনকে অনুরোধ করেন। তখন বিশ্বব্যাংকের বোর্ডসভায়ও আলোচনা হয়। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়নি। তিন্তু বিশ্বব্যাংক প্রধান তার মেয়াদ হওয়ার আগের দিন পদ্মাসেতু প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধের অর্ডার দিয়ে যান।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধের পেছনে ছিলেন ড. ইউনূস। তার মধ্যে যদি দেশপ্রেম থাকতো তাহলে কী করে তিনি দেশের এত বড় ক্ষতি করেন?
‘কিন্তু অর্থায়ন বন্ধ করে তারা দুর্নীতির ধোঁয়া তুললো। তাদের একজন অফিসার বাংলাদেশে এসে বলে গেলেন, পদ্মাসেতুতে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা প্রমাণ চাইলাম। কিন্তু তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হয়। ঘোষণা দিলাম নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, এই প্রকল্প নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নাম রটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমার ছেলে জয়কে আমেরিকার তদন্ত সংস্থা ডেকে নিয়েছে। জয় বলেছে- আপনারা দেখেন কোথায় কি হয়েছে? রেহানার দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে। কিন্তু তারা কোথায়ও কিছু পেলো না।
‘এরপর সব কিছু ভুল প্রমাণিত করে কানাডার ফেডারেল কোর্ট বলে দিয়েছে, এ প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মাসেতু প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধের পেছনে যে অপমান করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করা হয়েছে- তার পেছনে উসকানিদাতা আমার দেশেরই লোক।
‘এদের কোনো দেশ প্রেম থাকতে পারে না। গরিবের টাকায় সুদ খেয়ে যারা বড় লোক হয় তারা দেশের মানুষকে কখনও ভালোবাসতে পারে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমি সমর্থন দিয়েছি। গ্রামীণ ফোনের লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংক পাওয়ার কথা ছিল। সেখান থেকে দরিদ্র মানুষের জন্য সেই টাকা ব্যয় করার কথা ছিল। কিন্তু ফোনের কোনো লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংক পায়নি।’
শেখ হাসিনা বলেন, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতু করার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশের মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে। অনেকেই মনে করতো বাংলাদেশ একটি দুর্যোগের দেশ, তাদের পক্ষে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়া পদ্মাসেতু করা সম্ভব নয়।
‘আমি একটা কথা বিশ্বাস করি- বাংলার জনগণের ওপর আমার ভরসা ছিলো। সেটা নিয়েই আমি এ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি। এখন পদ্মাসেতুর ৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে। নদী শাসন করে সেতুকে ছোট করতে চাইনি। যতটুকু আছে সেটাই করা হচ্ছে। এখন ৭৫০ মিটার সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। এটা কঠিন কাজ। যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের ধন্যবাদ জানাই।’
তিনি বলেন, জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা, স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করা, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা আমার একমাত্র লক্ষ্য, আমার একমাত্র চাওয়া।
‘আল্লার কাছে দোয়া করবেন, এই পদ্মাসেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে- বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যারা নষ্ট করতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে যারা বাধা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের দারিদ্রসীমা অতিক্রমের পথ যারা বাদ বন্ধ করতে চেয়েছিল তাদের উপযুক্ত জবাব আমরা দেবো।’
শেখ হাসিনা বলেন, পাশাপাশি বাংলাদেশে মানুষের জন্য সুন্দর জীবন ক্ষুধামুক্ত দারিদ্রমুক্ত জীবন, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবো। আমরা ইতোমধ্যে সব সময় ৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি, পদ্মাসেতু নির্মাণ হলে আরও ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
‘বলা যায়, আমরা দুই ভাগ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারব। পদ্মাসেতু নির্মাণ হলে আমাদের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ উন্নীত করতে খুব একটা কষ্ট হবে না।’
প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম ও ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি। এই বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল, বাংলার প্রতিটি মানুষ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার সুযোগ পাবে। উন্নত জীবন পাবে এটাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটা যুদ্ধ বিধস্ত দেশকে গড়ে তুলে তিনি উন্নয়নের পথে যখন অগ্রযাত্রা শুরু করলেন, মানুষ উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল, সেই স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। পঁচাত্ততের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এরপরে আমরা দেখেছি হত্যা ও ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে হয়তো মুষ্টিমেয় লোকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছিল, কিন্তু বৃহৎ জনগোষ্ঠী অবহেলিত। মানুষের পেটে খাবার ছিলনা, পরনে ছিন্ন বস্ত্র, বিদেশ থেকে পুরনো কাপড় এনে দেয়া হতো, এক বেলাও খাবার পেতো না এমন বহু পরিবার। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই তো স্বাধীনতা। স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোর-গোড়ায় পৌঁছে দেয়া, এটাই হচ্ছে আমাদের কর্তব্য। ইত্তেফাক

মন্তব্য