Gmail! | Yahoo! | Facbook

কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে বাজেটীয় কৌশলের অসামঞ্জস্য

FacebookTwitterGoogle+Share

tayebফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে মোট কর্মোপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত ৬ কোটি ৮ লাখ। বাকি ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার বেকার না আছে শিক্ষায়, না প্রশিক্ষণে, না কাজে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় জিডিপির ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান হয়, তা ‘ইকোনমেট্রিক’ মডেলের মাধ্যমে প্রাক্কলন করে বিশ্বব্যাংক দেখিয়েছে, ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ভারতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় ৭ লাখ ৫০ হাজার, পাকিস্তানে এর পরিমাণ ২ লাখ, বাংলাদেশে ১ লাখ ১০ হাজার। প্রমাণিত কর্মহীন প্রবৃদ্ধি বা ‘জবলেস গ্রোথ’ সত্ত্বেও সরকার ও প্রশাসন কেন বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বেকারত্ব সমস্যার সমাধানে ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছে, তা সমন্বিত ও টেকসই উন্নয়নের নিরিখে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় নিতে হবে।

বাজেটে কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক বিশেষ উদ্যোগ নেই

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে বেকারদের কাজের সুযোগ সৃষ্টির (ঘরে ঘরে চাকরি) নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা ছিল ক্ষমতাসীন দলের, বাস্তবে এটি নিয়ে কাজই করেনি তারা। বাজেটে কোন মন্ত্রণালয়ে আগামী এক বছরে প্রশাসনের সব স্তরে কী পরিমাণ শূন্যস্থান পূরণ করা হবে, তার কোনো টার্গেট বা ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ডের উদ্যোগ নেয়া হয়নি; নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ তো দূরের কথা। উন্নত বিশ্বে কর্মসংস্থান বিশেষ সংকটে পড়লে (সাধারণত ১০ শতাংশের কাছাকাছি গেলেই) সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিয়োগ বাড়াতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি, যেখানে মাস ভিত্তিতে নতুন কর্মসংস্থানকে রেকর্ড করা হয়।

সমন্বিত কর্মসংস্থান পরিকল্পনার অভাব

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেসরকারি চাকরি বাজারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণভাবে সামঞ্জস্যে রেখে, একই বাজেটে বেশি কর্মসংস্থানের কৌশল না নিয়ে ব্যাপক শূন্যস্থান খালি রেখে দলীয় সমর্থনের অনুকূলে কমসংখ্যক লোককে উচ্চবেতন দিয়ে তুষ্ট রাখার হীনতা দেখিয়েছে সরকার। সরকারি কাজের পদ্ধতিকে কারিগরি আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করার দিকে না হেঁটে ঘুষ ও দুর্নীতি রোধের কথা বলে বেতন বাড়ানো হয়েছে, যা শুধু বুমেরাংই হয়নি, বরং মেধা ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনশীলতায় হয়েছে কাল। দেশের বাজেটের সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে পাবলিক সার্ভিস, যেখানে দেশের ৯৭ শতাংশ শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাত। সরকারি চাকরিতে বেশি বেতন হওয়ায় পুরো দেশের মেধাবীরা অনুৎপাদনশীল সরকারি খাতে কাজের দিকে ঝুঁকছেন। এতে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশেষায়িত কারিগরি শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত যুবক সাধারণ ক্যাডারের সরকারি কর্মে ঢুকে সাধারণ প্রশাসনিক কাজ করছেন। ফলে দেশের কারিগরি খাতে বিদেশীদের কর্মসংস্থানের পথ ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হচ্ছে। দেশের কারিগরি শিক্ষা বাজেটও অপব্যয়িত হচ্ছে এবং বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষাই প্রকারান্তে কর্মহীন হচ্ছে।

ক্যাডার পদবির বাইরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদগুলোর নিয়োগও ঘুষভিত্তিক প্রশাসনে কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক তদবিরের ইচ্ছানির্ভর। বিশেষজ্ঞ পদেও নতুন নিয়োগ দলীয় ক্ষমতায় কেন্দ্রীভূত বলে দলীয় না পাওয়া গেলে পদ ফাঁকা থাকছে। অযোগ্য দলীয় লোকেরা স্থায়ী কর্মসংস্থানের বদলে ঘুষ ও তদবিরের দালালি করছে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে আনুপাতিক হারে প্রতিবন্ধী নিয়োগের সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকটি একেবারেই অবহেলিত বলে বাংলদেশের প্রতিবন্ধীদের প্রায় সবাই কর্মহীন; যারা কিছুমাত্র কর্মহীন ভাতা পান, তা আবার টেকসই নয়।

বাজেটীয় কৌশলের লজ্জাজনক অদূরদর্শিতা

বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ১ শতাংশ বাড়াতে হলে ২৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। ফলে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই সেবা খাতে করপোরেট কর কমানোর পক্ষে বলেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে কৌশলহীন ও শর্তহীনভাবে বাদবাকি সব করপোরেট ও সেবা খাতকে বাদ দিয়ে শুধু ব্যাংকিং খাতের কর কমানো হয়েছে। এ কর হ্রাসের সঙ্গে রাজধানী থেকে ব্যবসা বিকেন্দ্রীকরণ এবং কর্মসংস্থানের কোনো শর্ত রাখা হয়নি, যা অবাক করা। অথচ এর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া যেত— ক. ঋণ প্রদান ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট স্বচ্ছতা আনা এবং খেলাপি ঋণের জন্য সঞ্চিতি বাড়ানোর টার্গেট দেয়া যেত, যাতে ব্যাংকগুলো এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি শক্তিশালী হয়ে বেসরকারি বিনিয়োগে প্রাণ ফেরাতে পারত;  খ. সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেয়া যেত, এতে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির বাধা বেশ কমে যেত; গ. দেয়া যেত ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতার খাত ও বরাদ্দ (করপোরেট সোস্যাল রেসপন্সিবিলিটির কোর ভ্যালু ও বাজেট) বাড়ানোর টার্গেট। এতেও নতুন নতুন সামাজিক কর্মসংস্থান বাড়তে পারত। শর্তহীন কর রেয়াতে অতিরিক্ত মুনাফার অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে দলীয় মদদপুষ্ট মালিক ও পরিচালকদের পকেটে চলে যাবে, কিছু পাচার হবে। আদতে তা কর্মসংস্থান বাড়াতে এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে না, যেহেতু সুদ কমছে না।

অনলাইন পণ্য বা সেবা কেনাবেচায় ভ্যাট আদায়ের সুপারিশ ই-কমার্স খাতের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে। অনলাইন কেনাকাটা যেখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ও নগরের রাস্তার যানজট কমাতে ভূমিকা রাখে, সেখানে এই বিকাশমান খাতে ভ্যাট বৃদ্ধি আরেকটি চরম অদূরদর্শিতা। ছোট ফ্ল্যাটে ভ্যাট আরোপ একদিকে মধ্যবিত্তের আবাসন সংকট বাড়াবে, অন্যদিকে ছোট অফিস নিয়ে কোম্পানি দেয়ার পরিকল্পনা করা যুবকের স্থায়ী ও চলতি আমানত (ক্যাপেক্স এবং ভাড়া হিসেবে ওপেক্স) দুটোই বাড়বে। এভাবে দেখা যাচ্ছে বাজেট কৌশল ও পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান-বিষয়ক দিকগুলোয় উদ্দেশ্যহীনতা ও দূরদর্শিতার অভাব প্রকট, বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর্থিক খাতের দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক সুবিধাবাদ।

শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার আসন বরাদ্দের অসামঞ্জস্য

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার বিষয় ও আসন বিন্যাস গতানুগতিক। শ্রমবাজারের মোট বার্ষিক চাহিদানির্ভর নতুন নতুন বিষয় চালু ও পুরনো বিষয় পরিবর্তনের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নতুন ও বিশেষায়িত চাহিদার স্কিল সেটগুলোয় পর্যাপ্ত মানবসম্পদের অভাব রয়েছে, আবার সরকার বিসিএস সাধারণ ক্যাডারের নাম করে বিশেষায়িতদের অনুৎপাদনশীল দাপ্তরিক কাজে নিয়োগ দিচ্ছে। কারগরি শিক্ষার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট ও উচ্চমান ট্রেনিং, বাজারের ঝোঁক ও সমস্যার কেস স্টাডি, থিসিস এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার যোগ না থাকায় স্কুলশিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শ্রমের বাজার চাহিদার বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। বেসরকারি খাতে বেতন কম ও দীর্ঘ শ্রমঘণ্টা থাকার কারণেও সরকারি খাতে আগ্রহ বাড়ছে। মেধা ও উৎপাদনশীল খাতের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এতে। ফলে কর্ম খালি থাকলেও বাজারে মানসম্পন্ন মানবসম্পদ নেই প্রকট যোগ্য লোকের অভাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও যোগ্য লোক তৈরির আদলে তৈরি করা হয়নি, যা বিদেশীদের কর্মসংস্থান উন্মুক্ত করছে বেশ ভালোভাবে।

সরকারি-বেসরকারি খাতে গবেষণা হচ্ছে একেবারেই কম। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের মাত্র ২ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় হয়। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো মানের গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু গবেষণাকর্ম কাগজেই থেকে যাচ্ছে। গবেষণার সুফল গ্রাহক প্রান্তে না আসায় গবেষক কাজ শেষে কার্যত বেকার হয়ে পড়েন বা বিদেশে চলে যাওয়ার চেষ্টায় থাকেন। কর্মসংস্থানে দেশী গবেষক ও গবেষণা অবহেলিত বলে বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের টেকসই দিকগুলোও অবহেলিত থাকছে, কর্মসংস্থান তো বটেই।

অন্যদিকে সেমিস্কিল কাজের (নির্মাণ শ্রম, প্লাম্বিং, কার্পেন্টিং, পেইন্টিং, ওয়েল্ডিং, অটোমোবাইল, ইলেকট্রিশিয়ান, গৃহশ্রম ইত্যাদি) শত শত স্বল্প কারিগরি সক্ষমতার কর্মসংস্থানকে সহজ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সনদসহ প্রতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়নি বলে এসব খাতে কাজ করা লোকেরা স্বীকৃতিহীন থাকছে, আনুষ্ঠানিক নিয়োগ পাচ্ছে না। ফলে এ খাতগুলো এজেন্টের মাধ্যমে আউটসোর্স হয়ে পড়ায় মূল শ্রমিকরা ঠকছেন। আরেকটি দিক হচ্ছে, স্বীকৃতি না থাকায় এ খাতগুলো পেশা হিসেবেও জনপ্রিয় হচ্ছে না। স্বল্পসংখ্যক সেমিস্কিল্ড শ্রমিক দীর্ঘ শ্রমঘণ্টায় রাত-দিন কাজ করছেন এবং এতে ব্যাপক কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছে দালাল বা এজেন্ট। অথচ এ খাতগুলোকে সনদসহ প্রাতিষ্ঠানিক করে এর সঙ্গে মানবিক শ্রমঘণ্টার বিধান আনা গেলে এখানে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে।

বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মাঝারি ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প বৈদেশিক ঋণনির্ভর। এ ঋণগুলো এমনই শর্ত যুক্ত যে, এখানে ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল ডিজাইন, এমনকি স্কিল্ড, সেমিস্কিল্ড শ্রমিকও ঋণদাতা দেশ থেকে আসতে বাধ্য। ফলে এ প্রকল্পগুলোয় দেশীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই; সুযোগ রাখা হয়নি ‘টেকনোলজি ট্রান্সফারের’ও। ফলে দেশীয় মানবসম্পদের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদে বড়ই নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

শিক্ষা ও সেবা খাতের নিয়োগ জনমিতিক হিসেবে বিন্যস্ত নয়

আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারের আকার ও পদ সংখ্যা ওই এলাকার মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বিন্যস্ত নয়। জনসংখ্যা অনুপাতে পুলিশ, আদালত, হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, পোস্ট অফিস, কাজী অফিস, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ইত্যাদি নেই। জনসংখ্যা অনুপাতে স্কুল নেই এবং নেই শিক্ষকও। আধুনিক শিক্ষা উপকরণহীন শুধু ব্ল্যাকবোর্ড ও টেবিল-চেয়ারের ক্লাসে ৬০ থেকে ১০০ জন ছাত্রছাত্রী মানহীন গতানুগতিকভাবে শিক্ষালাভ করছে। অথচ স্কুল ও শিক্ষক মাথাপিছু জনমিতির হিসাবে করা গেলে শুধু শিক্ষা খাতেই ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে, এমন সুযোগ আছে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা খাতগুলোয়ও।

কৃষি কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে

বিভিন্ন কারণে বছরে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করে কৃষিজমি কমছে। ফলন চাহিদানির্ভর এবং সমন্বিত নয়। এ সবকিছুর ফল হলো, কৃষক পণ্যের উৎপাদন মূল্য পাচ্ছেন না। ফলে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না এবং কৃষি থেকে উৎসাহ হারাচ্ছেন। কৃষি খাতের গতানুগতিক ভর্তুকির প্রক্রিয়া দুর্নীতিসহায়ক, সার ও ডিজেলের ভর্তুকি কৃষক প্রান্তে পৌঁছে না। তাই বাজেটে চাহিদার সঙ্গে সমন্বিত রেজিস্ট্রেশনভিত্তিক ফলন ব্যবস্থাপনা এবং বাধ্যতামূলকভাবে উৎপাদন মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজারমূল্য প্রদানের (পণ্যমূল্যে কৃষক প্রান্তে সরাসরি ইন্টারফেসের ভর্তুকি) একটা কৌশলগত পদ্ধতি চালুর দরকার ছিল, যা বিশ্বের দেশে দেশে বহু আগেই প্রবর্তিত। ফলন উৎপাদনকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাজার চাহিদা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আমদানি-রফতানির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা হয়নি। ফলনের সর্বনিম্ন বাজারমূল্য উৎপাদন খরচের বিপরীতে নিয়ন্ত্রিত নয়। কৃষিতে পণ্যের উৎপাদন মূল্য ও শ্রমমূল্য না আসায় কর্মসংস্থান কমছে। ফলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি সার্বিকভাবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান এগিয়ে নিতে পারছে না।

স্থবির শিল্প খাত

রাজনৈতিক আস্থাহীনতা, গুম, খুন, চাঁদা, দীর্ঘ জটিল ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া, জমি ও ফ্ল্যাটের উচ্চমূল্য এবং ভাড়া ও উচ্চসুদের মতো কারণে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ছে না। বহু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাধায় উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে একেবারেই পিছিয়ে বাংলাদেশ (বিশ্বে ১১৭তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সবার পেছনে)। ২০১০ সালে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের অবদান ছিল ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২০ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশীয় শিল্পে শ্রমিকের অতি দীর্ঘ দৈনিক শ্রমঘণ্টা এবং তথাকথিত ওভারটাইম নতুন নিয়োগে বড় প্রতিবন্ধক। কোম্পানিগুলো (এমনকি দেশী-বিদেশী করপোরেটগুলোও) অতি কম লোকবলে অতি বৃহৎ ব্যবসা চালায়। কেননা সরকার মানবিক শ্রমঘণ্টার কোনো বিধান করেনি। ফলে রাত-দিন বিরতিহীনভাবে কাজ করতে হয় বেসরকারি চাকরিজীবীদের। কোম্পানির বার্ষিক আয়-ব্যয়, লভ্যাংশের (ব্যবসার আকার) সঙ্গে তার শ্রমশক্তি বিন্যাস ও নিয়োগের আনুপাতিক হারের কোনো নির্দেশনা নেই। শুধু দৈনিক শ্রমঘণ্টা সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার বাধ্যবাধক বিধান করলে দেশীয় শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়বে ১৫  থেকে ২০ শতাংশ; বাড়বে কাজের মান, সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতাও। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কাজ হলো স্বাভাবিক ও মানবিক। গবেষণা বলছে, এর অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যহানি ঘটায়।

জিডিপি অনুপাতে ধারাবাহিক কমছে রেমিট্যান্সপ্রবাহ। আনস্কিল্ড ও সেমিস্কিল্ড শ্রমিকের বৈদেশিক চাহিদা দিন দিন কমছে। বিপরীতে স্কিল্ড শ্রমিক তৈরির একাডেমিক ভিত্তি তৈরি এবং সেভাবে বাজার খোঁজার চেষ্টা নেই। ফলে রেমিট্যান্সপ্রবাহে দীর্ঘমেয়াদে ভাটা আসার ধারা তৈরি হয়েছে, যা আবার অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলছে।

অঞ্চলভেদে উৎপাদন ও বণ্টনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট

বাজেটে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক উৎপাদন বরাদ্দ ও কর্মসংস্থানের টার্গেট কখনই নেয়া হয়নি, অথচ এটা স্থানীয় সরকারের ক্ষুদ্রতম ইউনিট ইউনিয়ন (এমনকি গ্রাম এবং ওয়ার্ডেও যেখানে স্থানীয় নির্বাচনী সীমা আছে) স্তর পর্যায়েও প্রয়োগ করা দরকার। প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের হিসাবে রেকর্ড ও ট্র্যাক করে উভয়ের মধ্যে ধারাবাহিকতা আনা গেলেই আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য আসবে।

অনুৎপাদনশীল ও কর্মহীন বাজেট শুধু ম্যাক্রো অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে গড়া, যার সঙ্গে মাইক্রো অর্থনীতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ ধারাবাহিকতা নেই; যা সামগ্রিকভাবে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র অর্থনীতির ব্যালান্স বা ইলাস্টিসিটিকে নষ্ট করেছে। ফলে কর্মসংস্থান সামগ্রিক অর্থনীতির ফলাফলের সঙ্গে মিলছে না।

কর্মসংস্থান বিস্মৃত বাজেট দেয়ার প্রথা বিলুপ্ত হোক। বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বেকারত্ব সমস্যার টেকসই সমাধান আসুক। অর্থ ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বোধ দূরদর্শিতা ও কৌশল জাগ্রত হোক। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক!

লেখক: প্রকৌশলী; সিনিয়র সফটওয়্যার সলিউশন আর্কিটেক্ট ভোডাফোন নেদারল্যান্ডস

faiz.taiyeb@gmail.com

- বনিক বার্তা / ৮ জুলাই ২০১৮

মন্তব্য