Gmail! | Yahoo! | Facbook

জাতিসংঘ আসলে পারে কী?

FacebookTwitterGoogle+Share

UNমারুফ মল্লিক।। সিরিয়ার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে জাতিসংঘের ব্যর্থতা ও একচোখা আচরণ স্পষ্ট। জাতিসংঘের পক্ষে আসলে জনসাধারণকে রক্ষা করা সম্ভবও না। জাতিসংঘ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই ধারণ ও বাস্তবায়ন করে। আর মৃত শিশুরা ওপার থেকে উপহাস করবে। তাই সময় হয়েছে জাতিসংঘের পুনর্গঠন নিয়ে ভাবার। উপহাস থেকে দায়মুক্তির। লিখেছেন মারুফ মল্লিক

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত জনমানসে কিংবা সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপর কোনো আবেদনই সৃষ্টি করে না। শান্তি স্থাপনে, জনসাধারণকে রক্ষার্থে জাতিসংঘ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বা জাতিসংঘের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। তবে কোথাও গণহত্যা সংগঠিত হওয়ার পর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে বা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্গঠনে জাতিসংঘ বেশ দক্ষতা দেখিয়েছে। জাতিসংঘ এখন অনেকটাই বৈশ্বিক ত্রাণ বিতরণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্লিন সংকট থেকে শুরু করে হালের সিরিয়া সংকট বা রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘ নিন্দা, বিবৃতি প্রদান ও নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করেনি। ১৯৬২ সালে কিউবায় মিসাইল সংকট সমাধানে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ভিয়েতনামে বা কোরিয়া উপদ্বীপের যুদ্ধে কী করেছে জাতিসংঘ? নাপাম বোমার চিহ্ন এখনো বয়ে বেড়ায় ভিয়েতনামিরা।

নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ার ঘৌতায় ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করেছে। এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কে মানল? রাশিয়া তো নিরাপত্তার পরিষদের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিল। কিন্তু ঘৌতায় হামলা থামেনি। রাশিয়া পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির সুযোগ দিয়েছিল। জঙ্গি বা বিদ্রোহীরা কি সেই সুযোগে জনসাধারণকে বের হতে দিয়েছে? ঘৌতার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিষদের থেকে রাশিয়া বা জঙ্গিরা অধিক শক্তিশালী।

সিরিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করতে না পারা, রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ বন্ধ করতে না পারলেও লিবিয়া বা ইরাকে সিভিলিয়ানদের রক্ষা ও গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র ধ্বংসের নামে ইরাকে, সোমালিয়ায় যুদ্ধের আয়োজন করে দিয়েছে জাতিসংঘ। ন্যাটো জোটকে বিশ্বের যত্রতত্র যুদ্ধের বৈধতাও দিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের ‘প্রোটেকশন অব সিভিলিয়ান’ ও বিভিন্ন প্রস্তাবের সুবিধা নিয়ে যুদ্ধবাজ জর্জ বুশ-টনি ব্লেয়াররা বারুদের গন্ধে বিষিয়ে দিয়েছে দজলা ও ফোরাতের পানি। দজলা ও ফোরাতের রক্তাক্ত দরিয়ায় বুশ-ব্লেয়ারের কুৎসিত চেহারা এখনো ভেসে ওঠে। জাতিসংঘ লিবিয়া ও ইরাকে সিভিলিয়ানদের রক্ষায় যতটা আগ্রহী মিসরের ক্ষেত্রে ততটা নয়। তাই জেনারেল সিসির মিসরে পাঁচ বছরে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ গুম হয়ে গেলেও জাতিসংঘের সিভিলিয়ান রক্ষার কথা মনে পড়ে না। কারণ পশ্চিমাদের স্বার্থ।

জাতিসংঘ কি শেষ পর্যন্ত লিগ অব নেশনের (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে গঠিত) পরিণতি ভোগ করবে? আন্তরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কি জাতিসংঘ ব্যর্থ? অকার্যকর হয়ে বা ভেঙে যাবে? জাতিসংঘ কার্যত বিশ্বের ক্ষমতাধর শক্তিগুলোর ভাগ-বাঁটোয়ারার সংঘে পরিণত হয়েছে। সেই সংঘে বসে ক্ষমতাধরেরা বিশ্বের কোন অংশের নিয়ন্ত্রণ নেবে, সেই ফয়সালা করা হয়। তাই কাশ্মীর সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারেনি এই প্রতিষ্ঠান। চোখের সামনে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো। সেই ফিলিস্তিনকেই এখন জাতিসংঘে গিয়ে আরজি জানাতে হয়, আমি সন্ত্রাসী না। আমরা নিজ ভূমির অধিকারের জন্য লড়াই করছি। বরং জাতিসংঘ দখলদার ইসরায়েলের পক্ষেই যেন কথা বলে। হামাস বা ফাতাহ সন্ত্রাসী সংগঠন কিনা নিরাপত্তা পরিষদে সেই নিয়ে বিতর্ক হয়। কিন্তু চোখ বেঁধে ফিলিস্তিনের প্রতিবাদী কিশোরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলাই বারণ। এতে আবার অ্যান্টিসেমেটিক তকমা পাওয়ার ভয় আছে। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময়ও সাক্ষীগোপালের ভূমিকায় ছিল জাতিসংঘ। বসনিয়ার সেব্রেনিতসায় সারা বিশ্বের সামনে গণহত্যা পরিচালনা করল সার্বরা। জাতিসংঘ বসে বসে দেখল। অভিযোগ রয়েছে জাতিসংঘর শান্তিরক্ষী বাহিনী সার্ব বাহিনীকে জ্বালানি তেল দিয়ে সহায়তা করেছিল। এখন আবার সেই সার্বদেরই ধরে ধরে সাজা দেওয়া হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, সার্বরা যদি গণহত্যার দায়ে সাব্যস্ত হয়, তবে সার্বদের জ্বালানি তেল দিয়ে সহায়তা করার জন্য গণহত্যায় সহযোগিতার দায়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী ডাচ সেনারা দোষী সাব্যস্ত হবে না কেন? এই প্রশ্ন তোলার এখনই উপযুক্ত সময়।

সিরিয়ার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় জাতিসংঘের ব্যর্থতা ও একচোখা আচরণকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘ কেন সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারছে না? জাতিসংঘের পক্ষে আসলে জনসাধারণকে রক্ষা করা সম্ভবও না। জাতিসংঘ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই ধারণ ও বাস্তবায়ন করে। বিশেষভাবে, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের অপ-ইচ্ছাকে বৈধতা দানের সুশীল রূপ হচ্ছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী শক্তির বৈশ্বিক জোট। যদিও প্রতিষ্ঠাকালে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিগ্রহ এড়িয়ে শান্তি স্থাপনের জন্য এই আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রতিষ্ঠা। কার্যত এটি ছিল বিজয়ী শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আইনগত এক প্রক্রিয়া। আধিপত্য বিস্তারে সারা বিশ্বের সম্মতি আদায়ের ক্ষেত্র হচ্ছে জাতিসংঘ। নিরাপত্তা পরিষদ হচ্ছে সেই ক্ষেত্র, যেখানে ভোটো ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাধরদের দাপট সবাই মেনে নিয়েছে।

বস্তুত, জাতিসংঘের গঠনকাঠামোতেই ত্রুটি রয়েছে। জাতিসংঘ আদৌ কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়। বিশ্ব মোড়লদের পাস কাটিয়ে কিছু করার ক্ষমতা জাতিসংঘে রাখা হয়নি। সিরিয়া সংকটের কথাই ধরা যাক। জাতিসংঘের পক্ষে সম্ভব হবে না বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আবরোধ আরোপ করা। কারণ, এতে রাশিয়া ভেটো দেবে। আবার জঙ্গি-বিদ্রোহীদের দমনে বাশারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করাও জাতিসংঘের পক্ষে সম্ভব না। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেন ভেটো দেবে। বাস্তবতা হচ্ছে, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইসরায়েল নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে সিরিয়ার ফ্রন্টে প্রকাশ্যে বা গোপনে লড়াই করছে। এই দেশগুলোর মোক্ষ লাভের পরই যুদ্ধ থেমে যাবে। এই লড়াইয়ে কেউ জিতবে। কেউ হারবে। বা কেউই হারবে না। যুদ্ধবাজদের মধ্যে সন্ধি হবে। শান্তি আসবে। এরিক মারিয়া রেমার্কের মত কেউ লিখবে ‘সিরিয়া রণাঙ্গন সম্পূর্ণ শান্ত’। বা অ্যানা ফ্রাংকের মতো কেউ ডায়েরিও লিখতে পারে। জাতিসংঘ সিরিয়ার পুনর্গঠনের মহাযজ্ঞে নেমে পড়বে। তবে যুদ্ধবাজদের কাছে হেরে যাবে আইলান কুর্দিরা। আইলান কুর্দিদের স্মরণে হাজার হাজার স্মৃতির মিনার নির্মাণ হবে। গ্রীষ্ম বা বসন্তে ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে আলেপ্পো, হোমস, ঘৌতার সেই সৌধগুলো।

কিন্তু আইলান কুর্দিরা নিশ্চিত করেই ওপার থেকে এসব যুদ্ধ, ফুল, মিনার, পুনর্গঠনের তামাশা দেখে উপহাস করবে। তাই সময় হয়েছে জাতিসংঘের পুনর্গঠন নিয়ে ভাবার। উপহাস থেকে দায়মুক্তির।

ড. মারুফ মল্লিক, রিসার্চ ফেলো, সেন্টার কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি।

 

মন্তব্য