Gmail! | Yahoo! | Facbook

ব্রাদারহুড ও হামাসের জনসমর্থনই কাল হলো!

FacebookTwitterGoogle+Share

masud majumderমাসুদ মজুমদার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭:

মেহেদি আকিফ ও মিসরের শাসক
মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের নন্দিত নেতা মেহেদি আকিফ আর নেই। তিনি ছিলেন ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতা, সপ্তম মুরশিদে আম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। বর্ষীয়ান এই নেতা আরব বসন্তের জের ধরে মিসরে সামরিক শাসনের প্রত্যক্ষ শিকার। সাজানো মামলায় তাকে ২৫ বছরের জেল দেয়া হয়। সামরিক সরকার জনরোষ আড়াল করতে তার পরিবারকে তাৎক্ষণিক লাশ দাফনের জন্য বাধ্য করে। ইতালি সরকার লিবীয় মুক্তিকামী মানুষের নেতা ওমর মোখতারের সাথেও এমন আচরণ করেছিল। অসহিষ্ণু শাসকেরা সবসময়ে লাশকেও ভয় পায়। তাই দ্রুত মাটিচাপা দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে।

মিসরে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি এখনো কারাগারে। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্যাঙ্গারু কোর্টে সাজানো মামলায় সাজা দিয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছে। মেহেদি আকিফ ছিলেন একজন চৌকস নেতা। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ক্ষণজন্মা এই নেতা জন্মেছিলেন ১৯২৮ সালে। ২০০৮ সালে মামুন আল হুদাইবির মৃত্যুর পর আকিফ ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতৃত্বে সমাসীন হন।

২০১০ সালে তিনি স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। তার স্থলাভিষিক্ত হন মোহাম্মদ বদি। ২০১৩ সালে দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। জনপ্রতিনিধিত্বশীল শাসনে ভীত, প্রভাবশালী আরব দেশ ও পশ্চিমা শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় নির্বাচিত সরকারকে উপড়ে ফেলা হলো। মোহাম্মদ বদিসহ প্রথম কাতারের অনেক নেতাই তখন থেকে মুরসির সাথে কিংবা আলাদাভাবে কারাগারে রয়েছেন।

মেহেদি আকিফকে ঠাণ্ডামাথায় ফৌজদারি মামলায় জড়ানো হয়। তার ‘অপরাধ’, তিনি আরব বসন্তকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে সামনের কাতারে ছিলেন। মেহেদি আকিফের মৃত্যুসংবাদ প্রথম নিশ্চিত করেছেন তার মেয়ে আলিয়া। এরপর নিশ্চিত করেন তার আইনজীবী আবদুল মোমিন আবদুল মকসুদ। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী হিসেবে কারাগারে তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটছিল। আলিয়া বাবার মৃত্যুসংবাদ জাতিকে জানিয়ে বলেন, ‘আমার আব্বা এখন আরশের প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হেফাজতে আছেন। আমরা সবাই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি, সবাইকে আবার তার কাছে ফিরে যেতে হবে।’ এটি মৃত্যুর পর সব বিশ্বাসী পঠিত দোয়াÑ ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউনের মর্মার্থ। আলিয়া এই দোয়াটি পড়েই তার প্রাণপ্রিয় বাবার মৃত্যু সংবাদটি জাতিকে অবহিত করেছেন। প্রতীকীভাবে শাসকদের জানিয়ে দিলেনÑ সিসির কারাগার নয়, এখন এই মহান নেতা আল্লাহর হেফাজতে, যেখানে শাসক ও জালিমের কোনো প্রবেশাধিকার নেই। একই সাথে আলিয়া দুর্বিনীত শাসকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেনÑ যতই ক্ষমতার দম্ভ ও অহমিকা প্রদর্শন করে জুলুম অত্যাচার করুন, শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হবে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছেই। আলিয়া নিজেও তার পিতার আদর্শের নিষ্ঠাবান অনুসারী। একই সাথে, দলের একজন প্রথম সারির নেত্রী।

মেহেদি আকিফকে ব্যক্তিগতভাবে জানার সুযোগ হয়েছিল ১৯৮১ সালে। এর এক বছর আগে ভারতের কেরালায় অপর এক সম্মেলনে সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম ব্রাদারহুড ব্যক্তিত্ব মোস্তাফা তাহানতানের। মেহেদি আকিফকে একান্তে পেয়েছিলাম ঢাকার অদূরে স্কাউট জাম্বুরিস্থল মৌচাকে। এশিয়া প্যাসিফিক জোনের আন্তর্জাতিক যুবসম্মেলনে। দুই সপ্তাহের এই সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। প্রায় ষোলোটি দেশের যুবসংগঠন তাতে যোগ দিয়েছিল। ক্যাম্প ডাইরেক্টর ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত যুবনেতা আনোয়ার ইবরাহিম। ক্যাম্প পরিচালনায় দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিসরীয় নেতা মেহেদি আকিফ। যুব সম্মেলনের ভোরের ও বৈকালিক অধিবেশন পরিচালনা করতেন মেহেদি আকিফ। চৌকস সুঠামদেহী ও বিনয়ী এই মানুষটির ভেতর নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার যে সংমিশ্রণ দেখেছিলাম, তাতে বিস্মিত হয়েছিলাম। মৌলিক মানবীয় গুণাবলি ও সময়ানুবর্তিতার যে উপমা তিনি হয়ে উঠেছিলেন, তাতেই বুঝেছিলাম তিনি অনেক উপরের স্তরের মানুষ। ত্রিশ বছর পর তিনি যখন ব্রাদারহুডের শীর্ষনেতার অবস্থানে তখন শ্রদ্ধামিশ্রিত একধরনের আবেগাপ্লুত করেছিল। যখন এই মহান ব্যক্তিদের সাথে পরিচয় ঘটে তখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ছাত্রজীবন দীর্ঘতর করার জন্য আইনের শেষ পর্বের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

এখন যেটি বেইলি রোডের মাথায় রমনা পার্কের ‘অরুণোদয়’ গেটের মুখোমুখি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ট্রেনিং একাডেমি, তখন এটি ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারের আবাসিক অফিস। প্রেসিডেন্ট জিয়া আন্তর্জাতিক যুবসম্মেলনে অংশ নিতে আসা সব দেশী-বিদেশী ডেলিগেটকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ভেনু ছিল ভাইস প্রেসিডেন্টের সেই আবাসিক দফতর। মঞ্চে প্রেসিডেন্ট জিয়ার দুই পাশে বসেছিলেন দুইজন। একজন মেহেদি আকিফ, অন্যজন আনোয়ার ইবরাহিম। মেহেদি আকিফ ছিলেন দৃঢ়চেতা, স্বল্পভাষী কিন্তু প্রাণচঞ্চল। স্মরণে পড়ে, তিনি এবং আনোয়ার ইবরাহিম দু’জনই সব ডেলিগেটের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছাবক্তব্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে ‘ব্রাদার’ সম্বোধন করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া সহাস্যে তাদের প্রতি বিনয় দেখিয়েছিলেন। বুঝিয়েছিলেন, আসলেই তিনি ‘ভাই’। সেই দিনগুলোতে মুসলিম বিশ্বে জিয়াউর রহমানের ভাবমর্যাদা তাকে ভ্রাতৃত্বের আসনেই বসিয়েছিল।

আজ মেহেদি আকিফ নেই, নেই শহীদ জিয়াও। একজন সামরিক শাসকের হাতে শাহাদতবরণ করেছেন, অন্যজন ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে। আমরা আছি। আনোয়ার ইবরাহিমও দীর্ঘ দিন ক্ষমতার পথ মাড়িয়ে এখন মালয়েশিয়ার বিরোধীদলীয় প্রভাবক নেতা। আজ বারবার মনে পড়ছে মেহেদি আকিফতনয়া আলিয়ার কথা। আমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবেÑ এই অনিশ্চয়তা ও এত সীমাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করেও আমরা একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে, জন্ম-মৃত্যুর বাগডোর অতিক্রম করে আমরা আকাশ ফুঁড়ে নিঃসীম নীলিমায় হারিয়ে যেতে পারব না। মাটি ভেদ করে অতলে যাওয়ার সাধ্যও নেই। তাই হে মানুষ ও শাসকবৃন্দ, ভূপৃষ্ঠে আস্ফালন করে বেড়ানোর পথ থেকে সরে এসো। আল্লাহ ও আল্লাহর অনুগত বান্দাদের ব্যাপারে সতর্ক হও।’

হামাস-ফাতাহ সমঝোতা
ফিলিস্তিন নিয়ে প্রায়ই লেখা হয় না। ফিলিস্তিনবাসীর দুঃখ দিনের কষ্ট সবার গা-সহা হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিরা যেন জন্ম থেকে জ্বলার জন্যই জন্মেছে। এর পরও মাঝে মধ্যে আশাবাদ জাগে। সম্প্রতি হামাস-ফাতাহ ঐকমত্যে পৌঁছেছে, তারা একসাথে পথ চলার চেষ্টা করবেন। এটি একটি প্রত্যাশার পুনর্জন্ম লাভের মতো। এ বিষয়ে আমাদের মন্তব্য ও পরামর্শ থাকা সম্ভব। তবে এর আগে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক দাউদ কুতুবের পর্যবেক্ষণটা সামনে রাখতে চাই, যা আলজাজিরার সৌজন্যে পাওয়া। দাউদ কুতুব মনে করেনÑ
‘নেতারা নিজের মানুষের কল্যাণের কথা সামনে রাখলে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কাছে ফিলিস্তিনবাসীর ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে। কারণ, তার উদ্বেগের মধ্যে গাজায় অবরুদ্ধ মানুষেরাও আছে। হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজায় জটিল পরিস্থিতির কারণে আব্বাসের পক্ষে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে ফিলিস্তিনের জাতীয় স্বার্থ নিরূপণে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কখনো কখনো কালো ছায়া ফেলছে।

হামাসকে আমলে না নিয়ে গাজা দখল করা কঠিন। কিন্তু সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ায় আব্বাসের সামনে এক বিরল সুযোগ এসেছে। তিনি এখন গাজায় তার প্রভাব বাড়াতে পারেন। মনে হচ্ছে, আব্বাস এই সুযোগ গ্রহণ করেছেন এবং নাটকীয় ফল লাভের জন্য হামাসের ওপর চাপ দিয়েছেন। হামাস প্রতিপক্ষ ফাতাহর সঙ্গে আলোচনায় রাজি হয়েছে। এমনকি তারা ফিলিস্তিনে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তারা দীর্ঘ দিন রামাল্লাভিত্তিক প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল অথরিটিকে (পিএ) গাজায় জায়গা দিতে চাননি।
সিরিয়া, ইরান, কাতার ও মিসর হামাসকে সমর্থন দিয়েছিল। ফলে গাজার নিয়ন্ত্রণ তারা ধরে রাখতে পেরেছেন। এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে হামাস কঠিন ও জটিল অবস্থায় পড়ে গেছে। মিসরে ব্রাদারহুডবিরোধী আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির উত্থানের কারণে রাফা সীমান্ত বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য দিকে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত হামাসকে সমর্থন দেয়া বন্ধ করতে কাতারের ওপর প্রচণ্ড চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

আব্বাস সুনির্দিষ্টভাবে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে চান। তাই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি গাজার জ্বালানি খরচ দেয়া বন্ধ করেছেন। এই আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হামাস রাজনৈতিক সমস্যায় পড়েছে ঠিকই, কিন্তু এতে আব্বাস তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট বিজয় লাভ করেননি; বরং রামাল্লা যে চাপ প্রয়োগ করেছে, তাতে নবনির্বাচিত হামাস নেতৃত্বের এক অপ্রত্যাশিত বন্ধু জুটেছে, তিনি হচ্ছেন মোহাম্মদ দাহলান। ফিলিস্তিনবাসীর পরিচিত মুখ।

২০০৭ সালে দাহলান নবনির্বাচিত হামাস সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরিণামে তিনি গাজা ছাড়তে বাধ্য হন। গাজার স্থানীয় অধিবাসীরা যারা বিগত কয়েক বছরে আরব আমিরাত নেতৃত্বের ভালোবাসাধন্য অনুসারী হয়েছিলেন, তারা সম্প্রতি গাজায় দাহলানের সাবেক প্রতিপক্ষকে সহায়তা করতে রাজি হয়েছেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে মাহমুদ আব্বাস তাকে ফাতাহ আন্দোলন থেকে বাইরে ছুড়ে ফেলেছিলেন। দাহলানের খুবই আশা ছিল, তিনি ফাতাহর নেতৃত্বে আসীন হবেন।

হামাস যে, দাহলানের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এর সঙ্গে সম্ভবত তার আরেকটি ইচ্ছার সম্পর্ক আছে। সেটি হলো তারা গাজার আর্থিক সমস্যার সমাধান এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা চান। মনে হচ্ছে এই পরিকল্পনা কাজে এসেছে। কারণ, কায়রোর নেতৃত্বের সঙ্গে দাহলানের সম্পর্ক ভালো। তারা সেটা করতে রাজি হয়েছেন এবং এই প্রক্রিয়ায় তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

হামাস এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গাজা শাসন করছে, কিন্তু রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গাজার সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ করে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সরকারি পরিষেবা যেমনÑ বিদ্যুৎ ও পানির ব্যয়ও তারা নির্বাহ করছেন। অন্য দিকে, ফিলিস্তিনি শহীদ ও কারাবন্দীদের পরিবারদের মাসোহারাও দিয়ে যাচ্ছেন তারা, সেই শহীদ পরিবার গাজা বা পশ্চিম তীর যেখানেই থাকুক না কেন। আইনগতভাবে রামাল্লার ফিলিস্তিন সরকার গাজার অধিবাসীদের কর মওকুফ করেছে, যদিও ক্ষমতাসীনেরা এখনো কিছু কর আদায় করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইসরাইল গাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ধ্বংস করা ছাড়াও তার ওপর ভূমি ও সমুদ্র অবরোধ আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলের এই অবরোধ নিরসনে অনেক চেষ্টা করলেও মানবিক পর্যায়ে কাক্সিক্ষত সফলতা পাওয়া যায়নি।

আমিরাতের পৃষ্ঠপোষকদের কল্যাণে দাহলান গাজায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানবিক সহায়তা দেয়ার মতো অবস্থানে আছেন। এ কারণে হামাস নেতৃত্বের পক্ষে ইসরাইলি অবরোধে বেঁচে থাকা এবং আর্থিক সহায়তা হ্রাসে আব্বাসের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা সম্ভব। তা সত্ত্বেও দাহলানের গাজায় ফেরত আসার মধ্য দিয়ে এই অবরুদ্ধ স্থানের মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না। এতে হামাস এবং পিএর ধ্বংসাত্মক বিরোধের তাৎক্ষণিক অবসান ঘটবে না।

বড় কথা, হামাস নির্বাচন করতে রাজি হয়েছে। নির্বাচন হয়ে গেলে পিএলও সংস্কার করে হামাস ও ইসলামিক জিহাদকে তার মধ্যে আনতে হবে। সংস্কারের পর ঐক্যবদ্ধ পিএলও প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কাউন্সিল সেশন আয়োজন করতে পারে। এর পক্ষে ঐকমত্যের জাতীয় কৌশল প্রণয়ন এবং আব্বাস-পরবর্তী যুগের মশালবাহীদের নির্বাচন করা সম্ভব।’

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক দাউদ কুতুব আদর্শিক বিরোধ সামনে আনেননি, কিন্তু সঙ্কট চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। উল্লেখ্য, ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়, হামাস ফিলিস্তিনে ইনতিফাদা বা গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছে। ব্রাদারহুড নেতৃত্ব দিয়েছে মিসরে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে গণতান্ত্রিক বাতাবরণের ভেতর কথিত আরব বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল। দুর্ভাগ্য কিংবা জিজ্ঞাসার বিষয় ব্রাদারহুডকে ও হামাসকে নিজ নিজ দেশের জনগণ মেনে নিলো, সামরিক শাসকেরা মেনে নিলো না কেন? বৃহৎ আরব দেশগুলো কেন সামরিক জান্তার সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়াল? সাম্রাজ্যবাদ মিসরে গণতন্ত্র চায়নি- এটাই কি কারণ, যেমনটি ইসরাইল চায়নি হামাসের উত্থান। এর জবাব খুঁজে পাওয়া জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটেও আমরা আশাবাদী, কারণ এত দিন ফাতাহ-হামাস আলোচনায় বসতেও রাজি হয়নি। বিবেচনায় নিতে হবে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস। এলাকাটি ইসরাইলের কারণে অবরুদ্ধ। ২০০৭ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামাস ও ফাতাহর মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। সেই নির্বাচনে হামাস জিতেছিল বলে দাবি করেছিল। তখন থেকে ফাতাহ ইসরাইল অধিকৃত পশ্চিম তীরে স্বায়ত্তশাসিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সরকার পরিচালনা করে আসছিল। গাজার নিয়ন্ত্রণ ছিল হামাসের হাতে।

সবার জানা রয়েছে, হামাস পরিচিত আদর্শবাদী প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে। ফাতাহ মুক্তিকামী রাজনৈতিক দল। ফাতাহ-হামাসের বিরোধের ফলে ইসরাইল সুবিধা পায়, ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ব্যাহত হয়। দীর্ঘ দিন সমান্তরাল দু’টি সরকার পরিচালনার কারণে ফিলিস্তিনি জনগণও আশাহত হতে থাকে। সংগঠন দু’টির কাছে আরব ও ফিলিস্তিনি জনগণ বারবার ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বপরিস্থিতি এই সঙ্কট আরো ঘনীভূত করেছে।
শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি মুক্তিকামী দল, হামাস ও ফাতাহ সমঝোতায় পৌঁছেছে। তারা একটি অভিন্ন সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে যৌথভাবে সরকার পরিচালনা করবেন। ২০০৭ সালের পর থেকে ফাতাহ এমনটি দাবি করে আসছিল এবং হামাসকে গাজায় প্রশাসনিক কমিটি ভেঙে দিতে অনুরোধ জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত হামাসের খালিদ মিশাল ও ফাতাহর মাহমুদ আব্বাস ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। ইতোমধ্যে সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী হামাস গাজায় প্রশাসনিক কমিটি ভেঙেও দিয়েছে। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। আরব জনগণ, ফিলিস্তিনবাসী, বিশ্বমুসলিম এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। এই সমঝোতার মাধ্যমে বিশ্বের সব শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশার প্রতি শুধু সম্মানই প্রদর্শিত হলো না, ২০১৪ সালের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর যে হতাশা দেখা দিয়েছিল, তার বিপরীতে নতুন করে আশাবাদী হওয়ার মতো ইতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো।

এটা স্পষ্ট যে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টা বারবার ভেঙে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এবারের সমঝোতা সবাইকে নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে। আশা করা যায়, এর ফলে ইসরাইলও অবরোধ প্রত্যাহার করার কথা বিবেচনায় নিতে বাধ্য হবে। কারণ ইসরাইল হামাসকে মেনে নিতে চায় না। হামাসকে তারা মনে করে ‘উগ্রবাদী সংগঠন’ যেমনটি সৌদি জোটও ভাবতে শুরু করেছে।
হামাস-ফাতাহর সমঝোতার ঐক্যের সরকার বাস্তবতা পেলে সব পক্ষকে ইস্যুটির স্থায়ী নিষ্পত্তির দিকে আগ্রহী করে তুলবে। এর মাধ্যমে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতার আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সব শান্তিবাদী ও স্বাধীনতাকামী মানুষ চান হামাস-ফাতাহর সমঝোতা অটুট থাকুক। তবে, একটা প্রশ্নের বা জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজে পাওয়া জরুরি। ব্রাদারহুডের ‘অপরাধ’ তারা মিসরবাসীর সমর্থন পেয়েছে, একই বক্তব্য হামাস সম্পর্কেও। নিজ নিজ দেশের জনগণের সমর্থন পাওয়া এবং গণ-অভ্যুত্থান বা গণজাগৃতির নেতৃত্ব দেয়া কি অপরাধ!

masud2151@gmail.com

নয়া দিগন্ত

মন্তব্য