Gmail! | Yahoo! | Facbook

‘রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল গড়া দরকার’- সাক্ষাৎকারে সাখাওয়াত হোসেন

FacebookTwitterGoogle+Share

sakhawat hossainঅব: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন এনডিসি পিএসসি ১৯৬৬ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি শাখায় কাকুলস্থ পিএমএ থেকে কমিশন পান। তিনি সেনাবাহিনীর স্টাফ ও কমান্ড, উভয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে কাউন্টার ইনসার্জেন্সি অপারেশনে ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড কমান্ডার। অধ্যয়ন করেছেন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টাফ কলেজে এবং পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজেও। স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ে তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস থেকে এমফিল সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে পিএইচডি ফেলো হিসেবে গবেষণা করছেন ‘ইলেকটোরাল গভর্ন্যান্স রোল অব ইলেকটোরাল ম্যানেজমেন্ট বডি অ্যান্ড স্টেকহোল্ডার্স ইন দি কনটেক্সট অব বাংলাদেশ’- এ বিষয়ে। সন্ত্রাসবাদ, দক্ষিণ এশীয় ভূকৌশল, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন কমিশনার ছিলেন (২০০৭-২০১২)। নির্বাচনী সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গ্রুপের সদস্য হিসেবে। সম্প্রতি নয়া দিগন্তের সাথে তিনি একান্ত সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গা সমস্যার বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- আলফাজ আনাম

প্রশ্নঃ রোহিঙ্গাদের ওপর এবারের নিপীড়নের কারণ কী বলে মনে করেন?
সাখাওয়াত হোসেন : আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। বার্মা স্বাধীন হয় ১৯৪৮ সালে। এরপর ১৯৬০ সালে যে নির্বাচন হয় তখন কিন্তু রাখাইন অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব ছিল। চারজন পার্লামেন্ট মেম্বারের মধ্যে তিনজন ছিল মুসলমান। এর একজন ছিলেন সুলতান আহমদ। যার ছেলে কো নিকে এ বছরের ২৯ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুনে হত্যা করা হয়। কো নি সংবিধান আইনে বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। কো নি হত্যার পর থেকে পরিস্থিতি ঘনীভূত হতে থাকে। মিয়ানমারের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিয়াংসির প্ররোচনায় তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

১৯৮২ সালে সামরিক সরকার আটটি উপজাতিকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দেয়া হয়নি। তাদেরকে রোহিঙ্গা নয় বেঙ্গলি সেটেলার বা বাংলাদেশ থেকে আসা বসতি স্থাপনকারী এমন যুক্তি দিয়ে নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে না। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বর্তমান কমান্ডার ইন চিফ বলছেন, আগের সরকারগুলো বেঙ্গলি ইস্যু সমাধান করতে পারেনি এখন যে সরকার আছে তারা এই বেঙ্গলি ইস্যু সমাধান করবে। এর অংশ হিসেবে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চলছে।

প্রশ্নঃ  রাজনৈতিক দল বিশেষ করে সু চির ভূমিকাও তো আমরা একই রকম দেখছি।
সাখাওয়াত হোসেন : হ্যাঁ। যাকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলা হয় সেই অং সান সু চি এখন এই ইস্যুতে সেনাবাহিনীর সাথে হাত মিলিয়েছেন। এখন যা দেখা যাচ্ছে, একটি জনগোষ্ঠী যারা ১৫ থেকে ২০ লাখের মতো ছিল তাদের নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। হত্যা করা হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে। এসব লোক কোথায় যাবে? দুনিয়াতে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের মধ্যে যাদের সামান্য অর্থ ছিল তারা বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে চার লাখ রোহিঙ্গা এসেছে। এবার জাতিসঙ্ঘ বলছে এক লাখ ২৩ হাজার এসেছে। সব মিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই জনসংখ্যা অনেক বেশি। এদেরকে বলা হচ্ছে অনুপ্রবেশকারী। অনেক সাংবাদিকও বলছে অনুপ্রবেশকারী। কেনো তাদের অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে জানি না। এরা তো রীতিমতো তাদের দেশ থেকে উৎখাত হয়ে এ দেশে এসেছে। তাদের শরণার্থী বলা হবে কি না তা ভিন্ন বিষয়।

প্রশ্নঃ  মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর ভেতর থেকে চাপ সৃষ্টির কোনো পথ কি নেই?
সাখাওয়াত হোসেন : মিয়ানমারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে। এর দায়িত্ব পালন করছেন সেনাবাহিনীর কর্মরত তিনজন প্রভাবশালী লেফটেন্যান্ট জেনারেল। মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে জাতিগত নির্মূল অভিযানে এদের হাত আছে। এদের মধ্যে যিনি সিনিয়র জেনারেল বা সিএনসি, তারও এমন ভূমিকা আছে। দেশটির বর্ডার ম্যানেজমেন্ট মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে। এখানে সু চি বা তার এনএলডি পার্টির কিছু বলার বা ভূমিকা রাখার কিছু নেই। এরা সু চির কথা শোনার লোক নন। কারণ, সাংবিধানিকভাবে তারা এসব পদে নিয়োগ পেয়েছেন। সু চি কিছুই করতে পারবে না। তিনি তো পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্র। আসলে মিয়ানমারে একটি দ্বৈত সরকার আছে। যার মূল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে।

প্রশ্নঃ  এ অবস্থায় বাংলাদেশের ঠিক কী করণীয় বলে মনে করেন?
সাখাওয়াত হোসেন : আমার কাছে মনে হচ্ছে কোনো কারণে সরকারের মধ্যে মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে সরকার কী করবে, তা ঠিক করতে পারছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মনে হয় এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছে।

প্রশ্নঃ  গুরুতর এমন সমস্যায় দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেন?
সাখাওয়াত হোসেন : সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিভাজন আছে, সঙ্ঘাত আছে। জাতীয় কোনো বিষয়ে ঐকমত্য নেই। এক নীতি বা সুর নেই। সরকারের সহযোগিতা চাওয়া বা সরকারকে সহযোগিতা করার কোনো মানসিকতা নেই; যে কারণে এ মুহূর্তে সরকারে আরো যেসব সমস্যা আছে রাজনৈতিক সমস্যা, সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে সমস্যা আছে। এমন পরিস্থিতিতে এত বড় একটি সমস্যা নিয়ে সরকার এখনো ঠিক করতে পারছে না কোন পথে যাবে। মাত্র এক দিন আগে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী বললেন মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এত দিন এ ধরনের কোনো কথা হয়নি।

প্রশ্নঃ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করেন?
সাখাওয়াত হোসেন : এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসঙ্ঘ সম্পৃক্ত হয়েছে। তুুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। ঘটনা তো বাংলাদেশে। বাংলাদেশে আরো বেশি সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। এখন প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর আরো জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নেয়া দরকার।

প্রশ্নঃ  কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কতটা সাফল্য আসবে?
সাখাওয়াত হোসেন : অনেকে সামরিক সমাধানের কথা বলছেন। একুশ শতকে বাংলাদেশের মতো কোনো দেশ বা অন্য কোনো দেশ এককভাবে সামরিক সমাধান করতে পারবে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যেসব অঞ্চলে সামরিক সমাধান হয়েছে সেখানে জাতিসঙ্ঘের সমর্থনে হয়েছে। ধরুন একটি সেফ জোন বা নো ফ্লাই জোন তৈরি করা। কিংবা জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের মতো বিষয় আসতে পারে। এর আগে কসোভো, বসনিয়া-হারজেগোভিনায় হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতি মিয়ানমারে তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ, একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে।

প্রশ্নঃ সেফ জোন তৈরির বাস্তবতা আপনি দেখছেন?
সাখাওয়াত হোসেন : হ্যাঁ আমি মনে করি, রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল গড়া দরকার; এর মাধ্যমে একটা আপাত সমাধান হতে পারে। না হলে এসব লোক যাবে কোথায়? বাংলাদেশ তাদের কিভাবে রাখবে। বহু বছর হয়ে গেছে। তাদেরকে সেফ জায়গায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে রাশিয়া বা ভারতের মতো বিশাল কোনো ফাঁকা জায়গা নেই যে ছিটমহলের মধ্যে এরা থাকবে। এভাবে তারা কতদিন থাকবে? এর তো সুরাহা হতে হবে।

প্রশ্নঃ  মিয়ানমার সেনাবাহিনী বারবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে- এর মাধ্যমে কী তারা শক্তি প্রদর্শন করছে?
সাখাওয়াত হোসেন : হ্যাঁ, আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশের দিক থেকে সতর্ক করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো এরপর কী? তারা যদি আবার করে তাহলে আমরা কী করব? যারা এসব নিয়ে কাজ করছেন তাদের তো সব উপায় নিয়ে চিন্তা করার কথা। এখন সরকার তা কতটা করছে, তা দেখার বিষয়। এখনো তো আমরা জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দেখছি না।

প্রশ্নঃ বেশ কিছু দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
সাখাওয়াত হোসেন : আমরা তো দেখছি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি এসেছেন, এর আগে ইন্দোনেশিয়ার পররারষ্ট্রমন্ত্রী এসেছেন। মনে হচ্ছে তারা বাংলাদেশকে একধরনের চাপ দিচ্ছেন। এ সমস্যা নিয়ে যেন সরকার এগিয়ে যায়। তারা এই বার্তা দিচ্ছে তোমরা এগিয়ে যাও আমরা সমর্থন দিচ্ছি। সারা বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ হচ্ছে। চেচনিয়ার গ্রোজনিতে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে, উজবেকিস্তান থেকে মিয়ানমারের ফুটবল টিমকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। মালদ্বীপ বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। মালয়েশিয়া কড়া প্রতিবাদ করেছে। অর্থাৎ চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশকে এগুলো কাজে লাগাতে হবে।

প্রশ্নঃ  মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের চেয়েও তুরস্ক বা ইন্দোনেশিয়া অনেক বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে কেন?
সাখাওয়াত হোসেন : ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার কারণ হচ্ছে এই দুই দেশে অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। এ ছাড়া এ ধরনের একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে তাতে যেকোনো দেশ এর প্রতিবাদ করবে। মুসলিম জনগোষ্ঠীকে মুসলমান হিসেবে নির্যাতিত করা হচ্ছে। তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া এ কারণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ এসব দেশের ভেতর থেকে সরকারের ওপর চাপ আছে।

প্রশ্নঃ  আসলে আন্তর্জাতিক চাপ মিয়ানমার কতটা গ্রাহ্য করবে বলে মনে করেন?
সাখাওয়াত হোসেন : মিয়ানমার অনেকটা বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র। ১০ বছর আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক দুনিয়া থেকে তারা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ছিল। সামরিক সরকার দেখছে তারা কারো সাহায্য ছাড়া এভাবে টিকে থাকতে পারে। এখন মিয়ানমারে এক ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক বাড়ছে। আর এর মূলে আছে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ। চীন এক সময় মিয়ানমারের বড় সহায়ক ছিল। সু চির উত্থানের পরে এখন সেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগ বাড়ছে। ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক স্বার্থ বাড়ছে। নতুন নতুুন শহর গড়ে উঠছে। যেহেতু মিয়ানমার বিশাল রাষ্ট্র ও অনেক সম্পদ আছে। বিপুল প্রমাণিত জ্বালানি তেলের মজুদ আছে। এ ছাড়া চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাড়তি সুবিধা দিয়েছে মিয়ানমারকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীনের প্রভাব কমাতে। অন্য দিকে ভারতের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে। সু চি ভারতে বড় হয়েছেন, লেখাপড়া করেছেন। ভারতের প্রতি তার এক ধরনের দুর্বলতা আছে।

প্রশ্নঃ  চীন ও ভারতের সাথে তো বাংলাদেশের সুসম্পর্ক। সে ক্ষেত্রে এই সঙ্কট সমাধানে কতটা সহায়ক হতে পারে?
সাখাওয়াত হোসেন : আসলে মিয়ানমারে ভারত ও চীনের জাতীয় স্বার্থের সাথে আমাদের স্বার্থ মিলছে না। আমার মনে হয় কিছু কিছু কারণে হয়তো চীনের সাথে আমাদের যে উষ্ণ সম্পর্ক তা থাকছে না। গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ এবং চীনা বিনিয়োগের ব্যাপারে তেমন অগ্রগতি নেই। এসব নিয়ে চীনের সাথে সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা থাকতে পারে। এ দেশে তো চীন ও ভারতের একধরনের প্রতিযোগিতা আছে। ভারতের প্রভাব এখানে অনেক বেশি। ফলে চীনের সাথে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ফলে পর্দার আড়ালে নানা ধরনের বিষয় এখানে কাজ করতে পারে।

প্রশ্নঃ  এ ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা কী হতে পারে?
সাখাওয়াত হোসেন : সরকারের সাথে ভারতের ভালো সম্পর্ক। সরকার ভারতের সাথে কথা বলে দেখতে পারে। তবে তাতে কতটা কাজ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মোদি যদি এ বিষয়ে কথা বলে তাহলে ভারতে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছে সে প্রসঙ্গ আসবে। বাংলাদেশের পক্ষে তিনি কথা বলবেন কি না, তাদের দৃষ্টিতে কথা ঠিক হবে কি না, সেসব ব্যাপার আছে। ইতোমধ্যে ভারত মিয়ানমারের পদক্ষেপকে সমর্থন দিয়েছে। তবে দিল্লির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা যেতে পারে, চীনের মাধ্যমে আমরা বলাতে পারি এগুলো বন্ধ করো। তবে সাফল্য নির্ভর করবে আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর। কিন্তু সে ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

প্রশ্নঃ  বাংলাদেশ কেন পারছে না?
সাখাওয়াত হোসেন : আসলে দেশের ভেতরে থেকেও তো সরকারের ওপর কোনো চাপ নেই। অনেক সময় কিন্তু সরকার চায়, তাদের ওপর চাপ আসুক। কিন্তু বামপন্থী-ডানপন্থী কারো তো কোনো কথা নেই। কোথায় সাংস্কৃতিক জোট, কোথায় হেফাজত কেউ তো দেখছি না। শত শত লোক মারা যাচ্ছে। একটি জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা হচ্ছে, কিন্তু সবাই নিশ্চুপ। এরা তো মানুষ। মানবিকতার দিক থেকেও তো কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। ইসলামপন্থী দলগুলোও তো নীরব। অভ্যন্তরীণ চাপ থাকলেও তো সরকার কিছু করার জন্য তাগিদ বোধ করত।

প্রশ্নঃ  মিয়ানমার এবারের ঘটনার জন্য সশস্ত্র একটি সংগঠনের তৎপরতাকে দায়ী করেছেÑ এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?
সাখাওয়াত হোসেন : সশস্ত্র তৎপরতা আগেও ছিল। কখনো বেশি, আবার কখনো কম। এই সশস্ত্র তৎপরতা ছাড়া তাদের আর কী উপায় আছে? যদি বেঁচে থাকতে হয়, তাহলে তারা কী করবে? এই সংগঠনের নেতার বিবৃতি আমি পড়েছি। তারা তো বলছে আমরা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিগোষ্ঠী নই। আমরা অধিকারের জন্য লড়াই করছি। আর এই অধিকার হচ্ছে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব লাভ করা। নাগরিক অধিকার পেলে ভূমি ও সম্পদের ওপর আমার অধিকার থাকবে। তারা বলছে অন্য কোনো দেশের সাথে তারা যোগ দিতে চাইছে না, কিংবা রাখাইন অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র করতেও চাইছে না। একটি দেশের ভেতরে একটি জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব দেবেন না, তারা তাহলে কী করবে?

প্রশ্নঃ  বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর আগে মিয়ানমারের কাছে যৌথ অভিযানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বিষয়টি কিভাবে দেখেন?
সাখাওয়াত হোসেন : বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়। এই যৌথ অভিযানের অর্থ কী আমি বুঝিনি। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।

প্রশ্নঃ এই যে বিপুলসংখ্যক লোক চলে এলো এর প্রভাব কী হবে বলে মনে করেন?
সাখাওয়াত হোসেন : বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী সমস্যা সৃষ্টি হবে। প্রথম হচ্ছে এসব লোককে কিভাবে রাখা হবে। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কিভাবে হবে। তারা যে অঞ্চলে আছে সেখানকার মানুষদের সাথে মিশে যেতে পারে। তাদের কতটা পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব হবে। অতীতে দেখা গেছে অনেকে বিদেশে চলে গেছে। কিন্তু সবার পক্ষে তো সম্ভব হবে না। এদের তো শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়নি। এখন শুধু মানবিকভাবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু শরণার্থী ঘোষণা করলে আন্তর্জাতিক মহলের দেখার কথা। বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের দায় বহন করা সহজ নয়। তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল বা অপরাধী চক্র এদের ব্যবহার করতে পারে। সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে এবং আরো অনেক কিছু হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। এই এলাকার পাহাড় গাছ নষ্ট হবে। আফগান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের সীমিত সম্পদ দিয়ে এই সমস্যা আমরা কিভাবে সমাধান করব। এর সাথে রাজনৈতিক সমস্যা আছে এদেরকে ভোটার করা হতে পারে।

প্রশ্নঃ  আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে কতটা সহায়তা আসতে পারে?
সাখাওয়াত হোসেন : এটা নির্ভর করবে আমার কিভাবে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে পারব তার ওপর। সহযোগিতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হোক, চীন, রাশিয়া কিংবা সৌদি আরব বা ওআইসির মাধ্যমে হোক। বিশেষ করে চীনের মাধ্যমে যদি চাপ সৃষ্টি করা যায় তা হবে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্নঃ কিন্তু কূটনৈতিক দক্ষতার সামর্থ্য কি আমাদের আছে বলে মনে করেন?
সাখাওয়াত হোসেন : দেখুন স্বাধীনতার পর ৪৬ বছর চলে গেছে। একটি স্বাধীন দেশের প্রায় ৫০ বছর কম নয়। শুরুতেই আমরা হয়তো জানতাম না কি করতে হবে। এখন যদি এই প্রশ্ন আসে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক। কূটনৈতিক কোরে এত দিনে তো বহু দক্ষ লোক তৈরি হওয়ার কথা। তারা তো এ ধরনের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে দক্ষ হওয়ার কথা।

নয়া দিগন্ত অনলাইন- ৮-৯-২০১৭

মন্তব্য