Gmail! | Yahoo! | Facbook

আলজাজিরার খোলা চিঠি

FacebookTwitterGoogle+Share

AL-JAZEERA৩০ জুন ২০১৭ঃ দুই দশক আগে আলজাজিরার আরবি অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়েছিল একটি সাধারণ উদ্দেশ্য নিয়ে। তা হলো- আরব বিশ্বের দর্শকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা। এর ১০ বছর পরে ২০০৬ সালে শুরু হয় আলজাজিরার ইংরেজি অনুষ্ঠান সম্প্রচার। তখনো উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন- বিশ্বজুড়ে মানুষকে সঠিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ তথ্য পরিবেশনা।
১৯৯৬ সালে যখন আলজাজিরার আরবি অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়, আরব বিশ্বের জন্য এটা ছিল অনন্য। তখন এ অঞ্চলে বেশির ভাগ মিডিয়া ছিল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এবং প্রায় সময়ে শাসক ও সরকারের এমন মুখপাত্র যাকে চ্যালেঞ্জ করা হতো না। আলজাজিরা ছিল ভিন্ন এবং সত্যিকার স্বাধীন কণ্ঠস্বর। এর উদ্দেশ্য ছিল- ইতঃপূর্বে অবহেলিত- এমন সব মানবিক কাহিনী শোনা আর রিপোর্ট করা; বিভিন্ন ঘটনার খবর ভারসাম্য ও সততার সাথে তুলে ধরা এবং ক্ষমতাসীন মহলকে দায়বদ্ধ করা।
আলজাজিরার আরবি প্রোগ্রাম অবিলম্বে গোটা আরব অঞ্চলে বিপুল ও আস্থাশীল দর্শক পেয়ে যায়। আমরা যেসব তথ্য পরিবেশন করেছি, তা বেশ কয়েক মিলিয়ন মানুষের জীবন প্রবাহে পরিণত হয়েছিল, যারা জানতে চায়- তাদের চার পাশে আসলে কী ঘটছিল।
‘আল জাজিরা অ্যারাবিক’ অদ্যাবধি আরব জগতের ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় নিউজ চ্যানেল। আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চ্যানেলগুলোর সম্মিলিতভাবে যত দর্শক, তার চেয়েও বেশি মানুষ দেখেন আলজাজিরা আরবি চ্যানেল।
আলজাজিরার ইংরেজি প্রোগ্রাম সারা দুনিয়ার ১৩০টিরও বেশি দেশের দর্শকরা দেখে থাকেন। কোটি কোটি মানুষ এর দর্শক যাদের শ্রদ্ধা রয়েছে আমাদের সাংবাদিকতার প্রতি। বিশ্বব্যাপী দর্শকেরা আলজাজিরার ওপর আস্থা রাখেন। এর কারণ, সাংবাদিকতার প্রতি আমাদের অব্যাহত অঙ্গীকার, তাদের সংবাদ নিরপেক্ষতার সাথে পরিবেশনে আমাদের ত্যাগ ও উৎসর্গিত মনোভাব, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই এবং সম্পূর্ণ সততার সাথে সংবাদ উপস্থাপনে আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।
আলজাজিরায় আমরা যে মিশনে বিশ্বাসী তা হলো- জনগণের অধিকার আছে তথ্য অবগত হওয়ার। তাদের এমন খবর জানার অধিকার আছে যা বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে প্রভাবিত নয়।
জনগণের চার পাশে এই বিশ্বে কী ঘটছে, তা জানার অধিকার তাদের রয়েছে। একইভাবে, জনগণের অধিকার আছে তাদের একটি কণ্ঠস্বর বা মুখপত্র থাকার। জনগণের প্রয়োজনে তাদের কথা বলা ও শোনা হবে- এটা তাদের অধিকার।
বাকস্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা বিশ্বের অনেক দেশেই স্বীকৃত। এসব হলো মানুষের অধিকার। তবে আরব বিশ্বের বিভিন্ন অংশে রাজনৈতিক স্বার্থে এই অধিকারকে প্রায় সময়ে চ্যালেঞ্জ করা হয়ে থাকে। নির্ভরযোগ্য তথ্য জানার অধিকার হচ্ছে- একটি সুস্থ সমাজের অন্যতম ভিত্তি।
কণ্ঠহীনের কণ্ঠস্বর
আমাদের সুদীর্ঘ ইতিহাসের শুরু থেকে যথাযথ সংবাদ পরিবেশন, ভারসাম্যপূর্ণ সাংবাদিকতা এবং সংবাদের বিষয় অনুসন্ধান ও উপস্থাপনের প্রতি অঙ্গীকারের ব্যাপারে আমরা দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছি। আমরা যার কণ্ঠস্বর নেই, তাকে কণ্ঠ দিয়েছি। আমরা সেসব মানুষ ও বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছি, যেগুলো অন্যথায় অন্ধকারেই পড়ে থাকত। আমরা এটা সর্বদাই করেছি দায়িত্বশীলতা আর সততার সাথে। পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকেই সাংবাদিকেরা আলজাজিরায় যোগ দিয়েছেন। এর কারণ, ভালো সাংবাদিকতার মিশন এবং এর সাথে যে দায়িত্ববোধ সংশ্লিষ্ট থাকে, তাতে তারা বিশ্বাসী। আরব বিশ্ব, আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা বিষয়ের খবর আমরা পরিবেশন করি প্রতিদিনই।
আমাদের স্টাফ আছেন তিন হাজারের বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে মেধাবী এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ সংবাদকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত তারা। তাদের অঙ্গীকারের কারণেই আলজাজিরা আজকের পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছে।
বিশ্বের ৭০টির বেশি স্থানে আমাদের ব্যুরো রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দোহায় আমাদের সদর দফতর এবং লন্ডন আর ওয়াশিংটনে সম্প্রচার কেন্দ্র। ব্যুরোগুলোতে এমন সাংবাদিকেরা নিয়োজিত যাদের সাহস ও নৈতিকতার কোনো হেরফের হয় না। তারা সরেজমিন রিপোর্ট করেন নানা ঘটনার ওপর। তারা কাজ করেন সততার সাথে। উৎসাহ, অনুভূতি এবং দায়িত্বশীলতার সাথে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। যারা পরিস্থিতির শিকার, তাদের কথা শোনার জন্য এই সাংবাদিকেরা যে অঙ্গীকারবদ্ধ, তার প্রমাণ পাচ্ছেন সবাই। আমাদের কর্মীরাই প্রতিষ্ঠানের মূল কাঠামো। তারা নিশ্চিত করেন যে, আমাদের সাংবাদিকতা সর্বোচ্চ মানের, নিরপেক্ষ এবং সততাপূর্ণ। আমাদের দর্শকের সংখ্যা অনেক মিলিয়ন, যারা আমাদের কাজের মানের সাক্ষী। প্রতিদিন প্রত্যেক মিনিটে দেশে দেশে লাখ লাখ মানুষ আলজাজিরাকে বেছে নিচ্ছেন তাদের তথ্যের উৎস হিসেবে।
যদি আমাদের সততা না থাকত, আমরা যদি নির্ভরযোগ্য না হতাম তাহলে আমাদের দর্শকেরা এ চ্যানেলের সুইচ অফ করে দেয়ার মতো বুদ্ধি-বিবেচনার পরিচয় দিতেন। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা আস্থা রেখে আসছেন আলজাজিরার ওপর। আমরাও তাদের প্রতি আস্থাশীল এবং তাদের তথ্য লাভের দাবির প্রতি বিশ্বস্ত।
আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, আমরা পক্ষপাতিত্ব করেছি, উসকানি দিয়েছি ‘আরব বসন্তে’, আমাদের বিশেষ মতলব আছে এবং আমরা একটি গোষ্ঠীর তুলনায় অন্য গোষ্ঠীকে বেশি সমর্থন দিই। আমরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি। আলজাজিরার সততার প্রমাণ এর পর্দায় পরিবেশিত অনুষ্ঠানমালা।
আমাদের সব অনুষ্ঠানই যে কেউ অনলাইনে এবং টিভিতে দেখতে এবং সূক্ষ্মভাবে যাচাই করতে পারেন। আরব বসন্ত’র মতো ঘটনাগুলো আমরা ‘কভার’ করেছি, সৃষ্টি করিনি। উত্তম সাংবাদিকতার নীতির অনুসরণে আমরা কোনো পক্ষ নেই না। বরং ক্ষমতাশালীদের গৃহীত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের আমরা দায়বদ্ধ রাখি।
আলজাজিরার কণ্ঠরোধ
এক সময়ে আমাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কারণ আলজাজিরাই প্রথম আরবি চ্যানেল যাতে ইসরাইলি রাজনীতিক ও ভাষ্যকারদের বক্তব্য সম্প্রচার করা হয়েছে। তবে আমরা এর মাধ্যমে যা করেছি তা হলো- সৎ সাংবাদিকতার লক্ষ্যে আমরা যে, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শুনেছি ও চ্যালেঞ্জ করেছি, তা নিশ্চিত করা।
আমাদের চরমপন্থার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো, যখন আমরা তালেবানের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিলাম। তবে আমরা আসলে তাদের জিজ্ঞেস করছিলাম কঠিন প্রশ্নগুলো। এভাবে আমরা সুনিশ্চিতভাবেই চ্যালেঞ্জ করেছি সংশ্লিষ্ট ঘটনার সব পক্ষকে।
আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে এবং বিশ্বাস করি জনগণের জানার অধিকারে। কোনো পক্ষ আমরা নেই না, আমরা কারো বার্তাবাহক বা মুখপাত্র নই এবং কখনো তা ছিলাম না।
আস্থাভাজন সব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মতো আলজাজিরাও তার পুরো অতীতজুড়ে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। আমাদের সাংবাদিকতা বাস্তবে কী ঘটছে, তা তুলে ধরে। কোনো কোনো সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা চান না যে, তারা যা করছেন, তা অন্যরা দেখতে পাক।
অতীতে আমাদের অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কয়েকটি দেশে, যারা চান না সত্যকে সবাই দেখতে পাক। এবার সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর তা করেছে।
আমাদের চ্যানেলগুলোর সম্প্রচারে ব্যবহারের স্যাটেলাইট টিভি এবং অনলাইন সিগন্যালগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণ আমাদের অনুষ্ঠান দেখতে না পায়। আলজাজিরার স্টাফদেরকে হুমকি দেয়া হয়েছে, আটক করা হয়েছে এবং মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। সাংবাদিক হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালনের ফলেই এসব পরিণতি ঘটেছে। ইরাক ও সিরিয়াসহ নানাস্থানে আমাদের সহকর্মীরা দায়িত্বে নিয়োজিত অবস্থায় চরম মূল্য দিয়েছেন।
কাতারের গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভবত বিব্রতকর ইস্যুগুলো নিয়েও আমরা রিপোর্ট করেছি। যেমন, নির্মাণশ্রমিকদের দুর্দশা এবং অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ।
আমরা এমন সব বিষয় তুলে ধরেছি যে কারণে বাহরাইন, আমিরাত ও সৌদি হামলার শিকার হতো হলো। যা বাস্তবে ঘটেছে, আমরা সেটাই দেখিয়েছি।
মিসর শুধু যে হামলা করেছে তা নয়, বিস্ময়কর হচ্ছে- সে দেশে আমাদের সহকর্মীদের কারারুদ্ধ করা হয়েছে; এবং দেয়া হয়েছে দণ্ড। তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’ হলো মহৎ সাংবাদিকতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার।
সৌদি আরব, বাহরাইন, মিসর ও আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো তাদের দেশের মিডিয়াকে নীরব এবং জনগণের কথা বলার অধিকার দমন করতে পারে। আরব জগতের এত বিপুল মানুষ আলজাজিরা দেখে যে, দেশগুলো চায়, আমরা বিদায় নিই। আলজাজিরা জানিয়ে দিচ্ছে, এর নেটওয়ার্ক ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ করে দেয়ার আলটিমেটামে এর দৈনন্দিন কার্যক্রমের ক্ষতি হবে না।
নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা
এসব রাষ্ট্র আলজাজিরাকে চাপ দেয়া এবং আমাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বলার পরও আমরা ভারসাম্য ও নিরপেক্ষতার সাথে আরব জগৎসহ বিভিন্ন ঘটনা কভার করেছি। আমরা এটা করে যাবো।
আমরা এমন এক নেটওয়ার্ক, যা সব মানুষের খবর দিতেই জন্ম নিয়েছে। বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষের কাহিনী শোনার জন্য আমরা বিদ্যমান আছি। আমাদের অনুষ্ঠান দেখেন কিংবা আমাদের পরিবেশিত খবর পড়েন, এমন প্রতিটি মানুষের মাধ্যমে এবং সব দেশেই যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ তথ্যগুলো আমরা প্রচার করছি- এটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই।
আলজাজিরাকে স্তব্ধ করে দেয়ার প্রয়াসের অর্থ, এ অঞ্চলে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে স্তব্ধ করার উদ্যোগ। প্রত্যেকের কথা শোনা এবং প্রত্যেকে তথ্য অবগত থাকার যে অধিকার, তার প্রতি এটা একটি চ্যালেঞ্জ। অবশ্যই এটা হতে দেয়া যায় না।
আমরা নিজেদের সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত গর্বিত। যাদের ব্যাপারে আমরা খবর পরিবেশন করি এবং যাদের তথ্য অবগত করি, তাদের প্রত্যেককেই আমরা শ্রদ্ধা করি এবং ধন্যবাদ দেই।
নির্ভরযোগ্য তথ্য পরিবেশন এবং আমাদের কভারেজপ্রাপ্ত সবাইকে কণ্ঠস্বর দেয়ার যে দায়িত্ব, তা পালন করে যেতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ ব্যাপারে আমাদের অঙ্গীকার অটুট। কাবুল থেকে কারাকাস, মসুল থেকে সিডনি পর্যন্ত বিশ্বের নানা ঘটনা ও বিষয় তুলে ধরার কাজে আমরা এগিয়ে যাবো।
সততার সাথে আমাদের দায়িত্ব পালন করা অব্যাহত থাকবে। সত্যের সন্ধানে আমরা সাহসিকতার পরিচয় দিতে থাকব। নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার যে অধিকার জনগণের রয়েছে, আমরা তাকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যাবো।
সূত্র : আলজাজিরা নিউজ
ভাষান্তর : মোহাম্মদ আবু জাফর

মন্তব্য