Gmail! | Yahoo! | Facbook

ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ

FacebookTwitterGoogle+Share

mango-litchiঢাকা, ২২ জুন ২০১৭ঃ লিচুর হার্ভেস্ট ডিউরেশন সর্বোচ্চ ৩ সপ্তাহ, ফলে চাষিকে মাত্র ৩ সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর উপ্তাদিত লিচুকে বাজারে নিয়ে যেতে হচ্ছে। বাজার স্পেইস বলতে জ্যৈষ্ঠের অতি উচ্চ গরমের (৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, উচ্চ হিমিডীটি, ডিউ পয়েন্ট, ডাস্ট ও এয়ার কন্টামিনেশন জনিত বহু কারনে রিয়েল ফিল ৪৫ থেকে ৫০) সময়ে বাঁশের খাঁচায় রাস্তার পাশে, ফুটপাতে কিংবা দোকানের সামনে আধো রোদ এবং আধো ছায়ায় রাখা স্থান। লিচুর ক্ষেত্রে দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরন পদ্ধতি হোল লিচু পাতার ভিতরে লুকিয়ে রেখে কয়েকটা দিন বেশি পচন থেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। এর বাইরে লিচু প্রক্রিয়াজাত করনে আমাদের কোন অর্জন নেই।

বিশেষ বিশেষ আমের (যেমন ল্যাংড়া, গোপাল ভোগ, লক্ষণ ভোগ, আম্রোপলি, ফজলি ইত্যাদির) হারভেস্ট মৌসুম ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৪ সপ্তাহ। বিপুল ভাবে উৎপাদিত আমের ডেস্টেনিও হাঁটে মাঠে ঘাটের উন্মুক্ত উচ্চ তাপ এবং রোদের স্থান। ফলে বিপুল উৎপাদনকে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরনের সুবিধা দিয়ে কৃষকের জন্য বর্ধিত বাজার অনুসন্ধান করে কৃষি নিরাপত্তা আনতে আমরা ব্যর্থ।

পিছনের ইকোনমি-
১। মাত্র ২-৩ সপ্তাহে বাজারজাত করনে বাধ্য হবার কারনে কৃষক দাম কম পান। উপরন্তু কোন বছর হারভেস্ট কালীন সময়ে খুব বেশি গরম পড়লে সোর্স এন্ডে দাম আরো কমে যেতে পারে।
২। খাদ্য ও ফলমূল প্রক্রিয়াজাত করনে এক্সসিলেন্স তো দুরের কথা, প্রক্রিয়াজাতকরনের ফেসিলিটি এক্সেসই না থাকায় এই কৃষি উৎপাদন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে না কেননা জ্যাম, ড্রাই ফ্রুট, ফ্রুট নেকটার কিংবা ভিনেগার প্রসেসড ফ্রুট, ফ্রুট জুস ইত্যাদি ডেভেলপ হয়নি, চাষিরা এই চেইনে আসেনি। শুধু ফ্রুট নেকটার বিক্রি করেই ব্যাপক আয় করা সম্ভব ছিল। এটা আম, জাম, পেয়ারার, কুল, কাঁঠাল ইত্যাদি বহুবিধ ফলের বেলায় প্রযোজ্য।

৩। কৃষি উন্নয়নে তিন তিনটি ব্যাংক থাকলেও মৌলিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করন আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং কৃষি অবকাঠামোর জন্য তৈরি বেসিক ব্যাংক অদুরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক দুর্বিত্তায়ন কেন্দ্রিক খেলাফি ঋণের রাষ্ট্রীয় ফাঁস!

৪। বাজারজাত করনের দ্রুততায় যার টাকা বেশি সেই শুধু ভোগের সুযোগ পায়। এবং এই সুযোগের অপচয় ঘটিয়ে নিউট্রিশনা ভ্যালু অনুসারে ডেইলি কঞ্জাপ্সনের পরিমানের ধার না ধরে ধনী ব্যক্তি অতি ভোজন করেন কিন্তু গরীবের পকেটে ঠিক সেই সময়ে টাকা না থাকলে সে একটি পুরো বছরের জন্য এই রকম ফলাহার থেকে বঞ্চিত হন।

৫। লীজ, বীজ, রাসায়নিক চাষ, অনুর্বরতা, সেচ ও সার সংক্রান্ত বহুবিধ ঋনের দায়ে জর্জরিত থাকায়​​ ফলন স্টরেজ করতে পারেন না​ আমাদের​ কৃষক​, উৎপাদনের অব্যবহতি পরেই তা বিক্রয় করে দিতে বাধ্য থাকেন। তার উপর​ উচ্চ আদ্রতার এবং উচ্চ তাপমাত্রার আবহাওয়ায়​ পচনশীল সবজি জাতীয় কৃষি পণ্য সংরক্ষণের কোন উপায়ই দেশে নেই,​ এগুলো নিয়ে কোন পরামর্শ নেই, টুলস সাপোর্ট নেই, গবেষণা নেই। নেই কোন ইনফাস্ট্রাকচার।

৬। কোল্ড স্টরেজ ফ্যাসিলিটি অতি সীমিত, প্রান্তিক কৃষক এখানে এক্সেস কম পান, সাধারণত মজুতদার কোল্ড স্টরেজ ব্যবহার করেন। তবে কারিগরি ব্যাপার হোল ভিন্ন ভিন্ন ফলনের চাহিদা মোতাবেক আমাদের কোল্ড স্টরেজ ক্লাসিফাইড নয়, দেখা যায় পুরটাই আলূর উপযোগী! ফলে কৃষকরা তারা এন্টি ক্লোরিনেটেড ওয়াটার, কার্বাইড কিংবা ফরমালিন ব্যবহার করছেন! ​উৎপাদিত পচনশীল পন্যের সংরক্ষণ না থাকায় মৌসুমের বাইরে ফলনের কোন বাজার নেই। এতে কৃষককে অনেক বেশি উৎপাদিত বাল্ক পণ্য মৌসুমেই বাজারে ছাড়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। (উদাহরণ ভিন্ন ভিন্ন জাতের আমের হারভেস্ট ডিউরেশন ৩-৪ সপ্তাহ, লিচূর মাত্র ২ সপ্তাহ,কাঠলের ৩-৪ সপ্তাহ ,সংরক্ষণ ব্যবস্থা না হাকায় এই ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যেই বাজারজাত করতে হবে!)। তাই পরিমানের তুলনায় বেশি উৎপাদন হলেও সমন্বিত বাজারজাতকরনের অভাবে পচনশীল পন্য পানির দরে সোর্স এন্ডে বিক্রি হলেও শহুরে বাজারে আকাশচুম্বী দাম দেখা যায়। এতে বিষ মিশিয়ে সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়ে, এই কাজ সাধারণত দালাল এবং মজুতদারেরাই বেশি করে। উপরন্তু বাংলাদেশ এমন একটি কৃষি উৎপাদনকারী দেশ যার পণ্য প্রবাসী বাংলাদেশীরা কিছু মাত্র ভোগ করলেও আমাদের কোন ভিনদেশি ভোক্তার আন্তর্জাতিক বাজার নেই, এর প্রধান কারন মানসম্পন্ন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরন, ফুড গ্রেড প্রসেস, মান্সম্পন্ন প্যাকেজিং এবং বিপণন। এই কাজে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, নেদারল্যান্ডস, ভারত এবং ব্রাজিলকে ফলো করতে পারে বাংলাদেশ।

৭। কৃষি পণ্যের বাজার বাজারঃ একটি ফলদ কৃষি পন্যের অন্তত ৬ রকমের বাজার থাকা চাই-

ক। মৌসুমে দেশি ভোক্তার বাজার
খ। মৌসুমে​র​ বাইরে দেশি ভোক্তার বাজার ​
গ। মৌসুমে ​বি​দেশি ভোক্তার বাজার ​ ​
ঘ। মৌসুমে​র বাইরে ​ ​বি​দেশি ভোক্তার বাজার ​
ঙ। এই পণ্য জাত প্রসেসড ফুডের বাজার দেশে (যেমন ফলের ক্ষেত্রে ড্রাই ফ্রুট,জুস, জুস তৈরির নেক্টার)
​​চ। ​এই পণ্য জাত প্রসেসড ফুডের বাজার বিদেশে (খেয়াল করবেন- পেয়ারার জুস পৃথিবীর অন্যতম দামি, কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে গরুতে খায় আমাদের দেশে!)।

আফসুস হচ্ছে, আমাদের কৃষকের বাজার “মৌসুমে দেশি ভোক্তার বাজার ” এই সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ মজুদকারীরা বিষ মিশিয়ে “খ” বাজার তৈরির চেষ্টায় আছেন, সেই সাথে পুরো খাদ্য চক্র বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, ঘরে ঘরে আজ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুকির মধ্যে। অথচ কৃষি প্রধান দেশে সরকারের আন্তরিকতা থাকলে মৌসুমে​র​ বাইরে দেশি ভোক্তার বাজার​ ফুড গ্রেড প্রসেসের মধ্যে থেকেই বের করা যায়। মোট কথা আমাদের কৃষি উৎপাদন বেশি মাত্রায় অনিয়ন্ত্রিত এবং আন এক্সপ্লোরড।

৮। এই ছয় রকমের বাজারের বাইরেও এই সময়ে অরগ্যানিক কৃষি পন্যের জন্যও এই ৬ টি প্যারালাল বাজার সৃষ্টি করা সম্ভভ। একজন কৃষককে মোট ১২ রকমের বাজারে তাঁর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করনের সুযোগ করে দিলে বাংলাদেশের কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তায় এক অভাবনীয় মাত্রা যোগ হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম কৃষি উৎপাদনকারী দেশ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আমাদের অর্জন একেবারেই নেই। বিশ্বের কোন খাদ্য মেলায় বাংলাদেশী স্টল চোখে পড়ে না। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার একেবারেই নিন্ম মানের, বিষ ও ভেজালে ভরা।

৯। সার্ভে ও গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অন্তত ১৫-২০% ভাগ ফল অনুন্নত ট্রান্সপোর্টেশন এবং বাজারজাতকরণে নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে আর্থিকভাবে সক্ষম মানুষ পুষ্টি গুণ বিচারে না করে অতি আহার করছে।

১০। বাংলার মাটি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি উতপাদন করে চললেও এর সুফল ভোগ করছেন না এদেশের কৃষক এবং পুষ্টি বঞ্চিত প্রান্তিক জনেরা। এই অতি অধিক পরিমান খাদ্য উৎপাদন চাপ বাংলাদেশের মাটি সইতে অক্ষম হয়ে পড়ছে দ্রুত। এর জাতক রাসায়নিক আগ্রাসন ও খাদ্য সংরক্ষণের অপকৌশলে পড়ে মাটি পানি এবং স্বাস্থ্য বিপর্জয়ে আক্রান্ত দেশ!

ফল (সাধারণভাবে খাদ্য শস্য) উৎপাদনের ব্যাপক অর্জনকে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরনে সঞ্চারিত করা গেলে সেটা হবে একটা টেকসই উন্নয়ন।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরনের সেন্স আসুক!
বাংলাদেশ এগিয়ে যাক!

উৎসঃ সবাক নির্বাক- এর ফেজবুক থেকে

মন্তব্য