Gmail! | Yahoo! | Facbook

ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাই না

FacebookTwitterGoogle+Share

syed_ibrahimসৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক।।

১০ মহররমের গুরুত্ব
আজ বুধবার, ১০ মহররম তথা ১২ অক্টোবর ২০১৬ এবং ২৭ আশ্বিন ১৪২৩। মহররম মাসের ১০ তারিখ দ্বীন ইসলামের ইতিহাসের আঙ্গিকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের আবেগ, চিন্তা-চেতনায় কারবালার ময়দানের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল। তাই আমার আবেগ কারবালার ময়দানের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করেই পরবর্তী আলোচনায় যাচ্ছি।

আমার কারবালা সফর
আমার চাকরিজীবনে এবং অবসরজীবন শুরু হওয়ার পরে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়ে অনেক দেশে গিয়েছি, সরকারি কাজে, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে অথবা বেড়াতে। কিন্তু তখন পর্যন্ত ঐতিহাসিক দেশ ইরাকে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ২০০২ সালেই মে মাসে একবার এবং অক্টোবর মাসে আরেকবার সুযোগ হয়েছিল ইরাক সফর করার। মনের অভ্যন্তরে দীর্ঘ দিন ধরে লালিত ইচ্ছার বাস্তবায়ন হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো জিয়ারত করা এবং ইতিহাসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশকে মূল্যায়ন করার সুযোগ হলো। দু’বারই আমাদের দলে আমিসহ মোট তিনজন ছিলাম। প্রথমবার গিয়েছিলাম, ১২ রবিউল আউয়াল তথা ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাগদাদ নগরীতে সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতে। দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম সাদ্দাম হোসেনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটের দিন নির্বাচনী পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে। দু’বারই হজরত ইউনুস আ:-এর সমাধি, হজরত আলী রা:-এর সমাধি, কারবালা নগরীসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলাম। মহান আল্লাহর নিকট অফুরন্ত শুকরিয়া। শুধু পাঠকের মনে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা সরল ও স্মরণ রাখার জন্য মনে করিয়ে দিচ্ছি, আমাদের সফরের ছয় মাস পরে, ২০০৩ সালের শুরুর দিকেই আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছিল।

ইমাম হুসাইন রা:
কারবালার যুদ্ধে যিনি নিষ্ঠুর পরিস্থিতির শিকার হয়ে শাহাদত বরণ করেছিলেন, তিনি আমাদের প্রিয় নবী রাহমাতাল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ সা:-এর অতিপ্রিয় ও স্নেহের কনিষ্ঠ নাতি, হজরত ইমাম হুসাইন বা হোসেন রা:। তিনি চতুর্থ হিজরির ৫ শাবান মোতাবেক ৬২৬ সালের ৫ জুন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা ছিলেন মহানবী সা:-এর আপন চাচাতো ভাই এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী রা:। তার মা রাসূল সা:-এর কন্যা হজরত ফাতেমা রা:।

হজরত আলী ও হজরত মুয়াবিয়া
৬৫৬ সালে ৮২ বছর বয়সে ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান রা: বিদ্রোহী আততায়ীর হাতে শহীদ হওয়ার পর হজরত আলী রা: তৎকালীন ইসলামি রাষ্ট্রের খেলাফতের দায়িত্ব নিতে প্রথমে বিনীতভাবে অস্বীকার করলেও কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবির অনুরোধে পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তার এই দায়িত্ব গ্রহণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেননি। উদাহরণস্বরূপ এমন তিনজন ব্যক্তির নাম- এক. মিসরের তৎকালীন শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ বিন সা’দ বিন সবুর, দুই. সিরিয়ার তৎকালীন শাসনকর্তা ও বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান এবং তিন. তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রা:-এর মন্ত্রণা সচিব হজরত মুয়াবিয়ার দূরসম্পর্কিত চাচাতো ভাই মারওয়ান বিন হাকাম। হজরত আলী রা: ৬৫৬ সালের ২৪ জুন তথা ৩৫তম হিজরি বছরের জিলহজ মাসের ২৫ তারিখে মদিনার মসজিদে উপস্থিত মুসলমানগণের আনুগত্য গ্রহণ করে খলিফার দায়িত্ব পালন শুরু করেন। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই একটি বিদ্রোহ বা যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়, ইতিহাসে যাকে বলা হয় উটের যুদ্ধ। অতঃপর তিনি চেলদিয়া ও মেসোপটেমিয়ায় বিদ্রোহ দমন করেন। এগুলো শেষ হতে না হতেই সিরিয়ার শাসনকর্তা হজরত মুয়াবিয়া বিদ্রোহ শুরু করেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি প্রশাসনিক রাজধানী মদিনা থেকে ইরাকের কুফায় স্থানান্তর করেন। মুয়াবিয়া কর্তৃক বাধিয়ে দেয়া যুদ্ধের এক পর্যায়ে সন্ধি হয় মুয়াবিয়ার পক্ষের সাথে। ৬৬১ সাল তথা ৪০তম হিজরি বছরের ১৭ রমজান রাজধানী শহর কুফায় হজরত আলী রা: আততায়ীর আক্রমণে শাহাদত বরণ করেন। কুফা শহরের পাশ দিয়ে ফোরাত নদী বহমান ছিল। ওই নদীর প্লাবন থেকে কুফা শহরকে বাঁচানোর জন্য একটি শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই বাঁধের পাশেই হজরত আলী রা:কে সমাহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে ওই স্থানে ‘নাজাফ’ শহর প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে নাজাফ মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশের নিকট অতি পবিত্র শহর।

হজরত হাসান রা: ও হুসাইন রা:
হজরত আলী রা: শাহাদত বরণের পর তার বড় ছেলে, অর্থাৎ হুসাইন রা:-এর বড় ভাই হাসান রা: ৩৬ বছর বয়সে ৪০ হিজরিতে ইরাক প্রদেশে খলিফা নির্বাচিত হন এবং সেখান থেকেই হিজাজ ও খোরাসান প্রদেশও শাসন করতেন। তার শাসনকালের চার মাসের মাথায় তৎকালীন অপর শাসনকর্তা মুয়াবিয়া কর্তৃক পুনরায় যুদ্ধ উসকে দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি হয়। সন্ধির অন্যতম শর্ত মোতাবেক, হজরত হাসান রা: মুয়াবিয়ার অনুকূলে খেলাফত ত্যাগ করে, ক্ষমতা পরিত্যাগ করে মদিনায় চলে যান। সন্ধির অপর শর্ত ছিল, মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর হজরত হাসান রা:-এর ছোট ভাই ইমাম হুসাইন রা: খলিফা নির্বাচিত হবেন। কিন্তু ৬৮০ সালে মুয়াবিয়ার মৃত্যু হলে তার পুত্র ইয়াজিদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং পিতা কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তি মান্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের মতে, উম্মাহর ধর্মীয় নেতা ও ইসলামি রাজ্যের শাসনকর্তা তথা খলিফা হওয়ার কোনো প্রকার চারিত্রিক, নৈতিক, শিক্ষাগত যোগ্যতা ইয়াজিদের ছিল না। এ কারণে হজরত আলী রা: এবং ইমাম হাসান রা:-এর ইরাকি সমর্থকেরা ইয়াজিদ বেআইনি ও অনিয়মিত বা প্রথাবহির্ভূত পদ্ধতিতে ক্ষমতার আসনে আরোহণ করায় তার প্রতি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।

হুসাইন রা: দায়িত্ব নেয়ার প্রেক্ষাপট
এরূপ ঘটনাবলির সময় ইমাম হুসাইন রা: অস্থায়ীভাবে পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থান করছিলেন। সঙ্কটপূর্ণ পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে কুফাবাসীদের উপর্যুপরি নিমন্ত্রণ ও আনুগত্যের আশ্বাসে ইমাম হুসাইন রা: মুসলমানদের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে সম্মত হন। ওই সময় কোনো কর্মপন্থা সুনিশ্চিতভাবে অবলম্বন করার আগে ইমাম হুসাইন রা: তার একজন জ্ঞাতিভাইকে (মুসলিম ইবনে আকিল) পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য ইরাকের কুফা নগরীতে প্রেরণ করেন। সেখানে হাজার হাজার মুসলমান, মুসলিম ইবনে আকিলকে সাক্ষী রেখে ইমাম হুসাইন রা:-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সেই হাজার হাজার মুসলমানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই জ্ঞাতিভাই মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হুসাইন রা:কে পত্র লেখেন, তিনি যেন মক্কা ত্যাগ করে ইরাক চলে আসেন। ইতোমধ্যে ইয়াজিদের খ্রিষ্টান উপদেষ্টাদের পরামর্শ মোতাবেক ইয়াজিদ ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে কুফার শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। দায়িত্ব নিয়েই ওবায়দুল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে মুসলিম ইবনে আকিলকে বন্দী হত্যা করেন। এই বন্দী করা ও হত্যা করার বিষয়টি ইমাম হুসাইন রা: জানতে পারেননি। কুফাবাসীর আমন্ত্রণেই খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার লক্ষ্যে ইমাম হুসাইন রা: রাজধানী কুফা শহরের উদ্দেশে ৬০ হিজরি সালের ৩ জিলহজ মক্কা ত্যাগ করে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, উমাইয়া বংশের স্বেচ্ছাচারী শাসনের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য যেসব মুসলমান ইমাম হুসাইন রা:-এর কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন, তাদেরকে সাহায্য করা তিনি কর্তব্য বলে মনে করলেন। কুফার উদ্দেশে অগ্রসরমান ইমাম হুসাইন রা:-এর দলটি ছিল অতি ক্ষুদ্র। এটি ছিল পরিবার-পরিজন ও পরিবারের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি ক্ষুদ্র দল। কোনো অবস্থাতেই কোনো যুদ্ধ-দল বা যুদ্ধের কন্টিনজেন্ট নয়।

কারবালার প্রান্তরে বাধ্যতামূলক অবস্থান
কুফা আসার পথেই এ দলটি ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের অশ্বারোহী বাহিনীর নজরদারিতে পড়ে। এই অশ্বারোহী বাহিনী ইমাম হুসাইন রা:-এর দলকে অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে আহ্বান জানায় এবং ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার দাবি জানায়। কিন্তু ইমাম হুসাইন রা: এই দাবি মানতে অস্বীকার করেন। কারণ, এই দাবি মেনে নেয়ার অর্থই ছিল অন্যায় ও অসত্যের সাথে, স্বেচ্ছাচারিতার সাথে আপস করা, তথা নতি স্বীকার করা। শেষ পর্যন্ত ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে হুসাইন রা:-এর দল অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফোরাত নদীর ইংরেজি নাম ইউফ্রেটিস। এই নদীর তীরে তখনকার আমলের কারবালা প্রান্তর ছিল ধু ধু মরুভূমি। এখানে শত্রুপক্ষ ইমাম হুসাইন রা:-এর দলকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার নিমিত্তে ফোরাত নদীর পানি ব্যবহার করার সব পথ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী কয়েকটি দিন শ্বাসরুদ্ধকর ও একতরফা শক্তি প্রদর্শনের চূড়ান্ত নমুনা দেখা যায়। অবরুদ্ধ অবস্থায় ইমাম হুসাইন রা:-এর দল কুফা থেকে সাহায্যকারী বা সমমনা দল আশা করেছিল। কিন্তু কুফা থেকে অনুগত মুসলমান বাহিনীও বিভিন্ন কারণে তথা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইমাম হুসাইন রা:কে সাহায্য করার জন্য কারবালার উদ্দেশে রওনা করতে পারেনি। এরূপ পরিস্থিতিতেই ১০ মহররম ৬১ হিজরি সকালে জনৈক উমার ইবনে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস চার হাজার উমাইয়া সৈন্যের সেনাপতি হিসেবে ইমাম হুসাইন রা:-এর মাত্র ৭০ বা ৭২ সদস্যের দলের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দণ্ডায়মান হয়। আত্মসমর্পণে আবারো অস্বীকৃতি জানানোর পর ইয়াজিদ বাহিনী ইমাম হুসাইন রা:-এর ক্ষুদ্র দলকে আক্রমণ করে। ইমাম হুসাইন রা:-এর বাহিনীর প্রায় সবাই শাহাদত বরণ করেছিলেন।

কারবালার আত্মত্যাগের মূল্যায়ন
পুনরায় উল্লেখ করছি, ভীষণ বড় ও বিস্তৃত একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে মাত্র তিন-চারটি অনুচ্ছেদে সারমর্ম করে প্রকাশ করা দুঃসাহসী ও কঠিন কাজ। অতএব, এ ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি মার্জনীয়। অনুরূপভাবে, মূল্যায়নও বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করতে পারছি না। কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন রা:-এর শাহাদতের ঘটনার মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইতিবাচক যেই প্রসঙ্গটি সবার আগে বলতে হবে, সেটি হলোÑ বেদনার পাশাপাশি একটি মহিমান্বিত আঙ্গিক আছে। কারণ সত্য ও ন্যায়, সাম্য ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্বৈরাচারী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইন রা: যেভাবে বীরবিক্রমে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, ত্যাগ চিরকাল দেশে দেশে যুগে যুগে এ ধরনের সঙ্কট ও সমস্যা উত্তরণের ব্যাপারে অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করবে। কারবালার ময়দানের ঘটনার পরই ইয়াজিদের ক্ষমতার ভিত নড়ে উঠেছিল। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মুসলিম জাতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। মুসলমানেরা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। এই ঘটনা মুসলিম জাতিকে তাদের ভেতরের শত্রু কারা, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে সাহায্য করে। পরবর্তীকালেও ইতিহাস সাক্ষী, মুসলমানেরা যখনই শত্রু আর মিত্র চিনতে ভুল করেছে, তখনই তারা বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। কারবালার ঘটনাটির বড় প্রভাব হলো, খেলাফতের পর গত প্রায় সাড়ে তেরো শ’ বছরে মুসলিম উম্মাহর ভেতর, দ্বীন ইসলাম রক্ষার যে চেতনা ও শৌর্যবীর্য আপন মহিমায় ভাস্বর রয়েছে, তার পেছনে কুরআন ও সুন্নাহর পরে ইসলামের ইতিহাসের যে ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সক্রিয় হয়েছে, কারবালার ঘটনা তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। কারবালার যুদ্ধ হয়েছিল মুসলমানদের মধ্যেই। একপক্ষে তথা শক্তিশালী পক্ষে ছিল মুসলমান নামধারী মুনাফিক, স্বার্থপর, ভোগবিলাসী এবং রাজতন্ত্র পন্থী মানুষ। কারবালার ঘটনার মাধ্যমে শাসকেরা বিজয়ী হয়েছিল, কিন্তু নন্দিত হতে পারেনি। অন্যায় করে বিজয় অর্জন করলেও যে নন্দিত হওয়া যায় না, ধিকৃত হতে হয়, কারবালার ঘটনা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কারবালা সম্বন্ধে অনেক বড় বড় পুস্তক রচিত হয়েছে, এ ঘটনাভিত্তিক উপন্যাস এবং কবিতা রচিত হয়েছে। যে কবিতাটির নাম সবার আগে আমার মনে আসে, সেটি হলো বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘মহররম’ কবিতা। পূর্ণ কবিতাটি ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, রাসূল সা:-এর পরিবারের প্রতি ভালোবাসা শাণিত করে এবং পাঠককে ঈমানি বলে বলীয়ান করে তোলে। এই কলামে স্থানাভাবে আমি বিখ্যাত কবিতাটির তিনটি স্থান থেকে মাত্র কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করছি।

মহররম কবিতা থেকে প্রথম উদ্ধৃতি
নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া / আম্মা, লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া, / কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে? / সে কাঁদনে আসু আনে সিমারেরও ছোরাতে। / … … গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা, / “আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা!” / নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার, / কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার! / দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস, / পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশমনও ‘সাব্বাস’! / দ্রিম দ্রিম বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা, / হাঁকে বীর শির দেগা, নেহি দেগা আমামা! /

কবিতা থেকে দ্বিতীয় উদ্ধৃতি
… … ‘আস্ মান’ ভ’রে গেল গোধূলিতে দুপুরে, / লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে! / বেটাদের লোহু-রাঙা পিরহান-হাতে,আহ্- / ‘আরশের’ পায়া ধরে,কাঁদে মাতা ফাতেমা, / “এয়্ খোদা বদ্লাতে বেটাদের রক্তের / মার্জনা কর গোনাহ পাপী কম্ বখতের।” / কত মোহররম এলো, গেল চ’লে বহু কাল- / ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল ! /

মহররম কবিতা থেকে তৃতীয় উদ্ধৃতি
ফিরে এল আজ সেই মহরম মাহিনা / ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। / উষ্ণীষ কোরআনের হাতে তেগ আরবীর / দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শীর। / তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা / শমশের হাতে নাও বাঁধ শিরে আমামা / বেজেছে নাকাড়া হাঁকে নকিবের তূর্য / হুঁশিয়ার ইসলাম ডুবে তব সূর্য … …।

ইসলামের যুদ্ধগুলো প্রসঙ্গে রচনা
মহানবী সা:-এর আমলে, খোলাফায়ে রাশেদার আমলে এবং তৎপরবর্তী চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের ইসলামের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাস আজকের প্রজন্মের নিকট প্রায় অজানা। ইসলামের ইতিহাস বা ইসলামিক হিস্ট্রি নামক বিষয় যদি কেউ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়েন, তাহলেই মাত্র কিছুটা তথ্য ওই ছ্ত্রা পাঠ্যপুস্তক থেকে পাবেন। সাধারণ মানুষের নিকট এ বিষয়টি একেবারেই অপরিচিত, অপরিবেশিত। এ কথা খেয়াল রেখে, ২০০৮ সালে তৎকালীন ইসলামিক টিভি (অধুনা বিলুপ্ত) কর্তৃপক্ষ আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, অন্তত ইসলামের সামরিক ইতিহাস যেন টেলিভিশনে তুলে ধরি বাংলাভাষী টিভি দর্শকের জন্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে পরপর ১৩ সপ্তাহে, ১৩টি ভিন্ন পর্বে, ইসলামের ১৩টি যুদ্ধের বর্ণনা বাংলাভাষী টেলিভিশন দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করার দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল। সময়টা ছিল মার্চ-এপ্রিল ২০০৮। আমি মনে করি, এটি মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমার জন্য একটি বিশেষ দয়া। কারণ, মহানবী সা:-এর আমলের যুদ্ধগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে আমাকে বিশেষভাবে জানতে হয়েছে এবং আমার সেই ক্ষুদ্র অর্জিত জ্ঞান দেশবাসীর সাথে শেয়ার করতে পেরেছি। কয়জনের সৌভাগ্য হয় মহানবী সা:-এর যুদ্ধের নেতৃত্বের বিষয়ে অন্যের সামনে উপস্থাপন করার? শতভাগ আদবের সাথে, শতভাগ রাসূল-প্রেমের সাথে এটা নাও হয়ে থাকতে পারে; অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটিগুলোর জন্য আমি মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী; নিশ্চিতভাবেই মহান আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করতে পারেন।

একটি ব্যতিক্রমী বই
টেলিভিশনের সেই ১৩টি মৌখিক উপস্থাপনা, পরবর্তীকালে বইয়ে প্রকাশ করার মতো করে সাজানো হয়েছিল। ঢাকা মহানগরের বিখ্যাত প্রকাশক ‘অনন্যা’ বইটি প্রকাশ করেছিলেন। এর নাম ‘দি ব্যাটেলস অব ইসলাম’ বা ইসলামের যুদ্ধগুলো। সেই বইয়ে ১২তম অধ্যায় হচ্ছে কারবালার ময়দানের যুদ্ধ। বিশদভাবে প্রেক্ষাপটসহ বইটির পরিচয় দিলাম একটি উদ্দেশ্য নিয়ে। তা হচ্ছে, সম্মানিত পাঠক, বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায় ইসলামের অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস যেন জানতে চেষ্টা করে। যেসব ছাত্রছাত্রী স্কুলের পাঠ্যসূচিতে ইসলামের ইতিহাস পড়েন বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয় পড়েন কিংবা মাদরাসায় পড়েন, শুধু তারা জানলে হবে না। ইতিহাসের উত্তরাধিকারী আমরা সবাই। বইটি নিশ্চিতভাবেই বাজারে অনেক জায়গায় পাওয়া যাবে, কিন্তু প্রেস ক্লাবের নিচে ‘বাতিঘর’ নামক দোকানে, ঢাকা মহানগরের নাটক সরণি খ্যাত বেইলি রোডে সাগর পাবলিশার্সে অবশ্যই পাবেন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি 
ই-মেইল : mgsmibrahim@gmail.com

নয়া দিগন্ত-১১ অক্টোবর ২০১৬

মন্তব্য