Gmail! | Yahoo! | Facbook

জীবনের গল্প: ‘গরুর মাংস খাইতে খুব মন চায়’

FacebookTwitterGoogle+Share

lokmanরোকেয়া রহমান।। ‘আমার নাম লোকমান। ভালা নাম সাফায়েত হোসেন। বয়স হইল গিয়া ১২ বচ্ছর। কেলাস ফাইভে পড়ি। ইশকুলের নাম মতিঝিল আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।’ নাম জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটি এক নিশ্বাসে এসব তথ্য আমাকে দেয়।
গত ২৬ জুন সকালে লোকমানের দেখা পাই রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। মায়ের সঙ্গে সে তখন বিভিন্ন বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করছিল। এরই এক ফাঁকে কথা বলি তার সঙ্গে। কথায় কথায় জানা গেল নানা তথ্য।
প্রতিদিন সকালে মায়ের সঙ্গে বের হয় লোকমান। তার মা শাহিদা বেগম প্রতিদিন রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকার প্রায় ২০০ বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ করেন। আর লোকমানের কাজ হলো মাকে সাহায্য করা। মা তার অসুস্থ কিনা।
জানতে চাই, ‘তোমার মায়ের কী অসুখ হয়েছে?’
‘মায়ের ডাইবেটিস আছে। গলার অসুখ আছে। কিছু খাইতে পারে না। খাইলেই গলায় বাইজ্যা যায়। ট্যাকার অভাবে ডাক্তার দেহাইতে পারে না।’
‘কত টাকা বেতন পান তোমার মা?’
‘সাড়ে সাত হাজার টাকা। কিন্তু সংসারে সব ট্যাকা খরচ হইয়া যায়। বাড়িভাড়া সাড়ে চার হাজার ট্যাকা। পানির বিল, কারেন্টের বিল দেওন লাগে। আমার পড়ার খরচও অনেক। ইশকুল থেইক্যা বেতন লয় না। তয় কোচিংয়ে ১ হাজার ২০০ ট্যাকা দেওন লাগে। এক খালার কাছে পেরাইভেট পড়ি। তারে দেওন লাগে ৫০০ ট্যাকা। হের উপর বাজার সদাই আছে। হের লাইগ্যা মায়ের কাছে ডাক্তার দেহানোর ট্যাকা আর থাকে না।’
লোকমানদের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায়। তবে গ্রামে তাদের যাওয়া হয় খুবই কম। এখন থাকে রাজধানীর উত্তর বাসাবোর এক কক্ষের একটি টিনশেড বাড়িতে। তার বাবার নাম মো. ইউনুস। শাহজাহানপুর অফিসার্স ক্লাবে থালাবাসন ধোয়ার কাজ করেন। মাস শেষে তিনি কত টাকা পান, তা লোকমান জানে না। সকাল ছয়টায় লোকমান মায়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর ময়লার গাড়ি নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ময়লা সংগ্রহের কাজে নেমে পড়ে। সাধারণত গৃহকর্মীরা ময়লা এনে গাড়িতে ফেলেন। যেসব বাসায় গৃহকর্মী নেই, সেসব বাড়ি থেকে ময়লা নিয়ে আসে লোকমান। বিনিময়ে মাস শেষে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা মেলে। কোনো কোনো বাসা থেকে নাশতাও মেলে।
রোজার মাস বলে এখন ময়লা সংগ্রহের পুরো সময়টায় সে মায়ের সঙ্গে থাকে। কিন্তু যখন স্কুল খোলা থাকে তখন নয়টার সময় বাসায় ফিরে যায়। এরপর তৈরি হয়ে স্কুলে যায়। সকাল ১০টা থেকে স্কুল শুরু। চলে বেলা দুইটা পর্যন্ত। এরপর আড়াইটা থেকে কোচিং শুরু হয়। শেষ হয় বিকেল চারটায়। বাড়ি ফিরে ভাত খেয়ে সন্ধ্যা ছয়টার সময় প্রাইভেট পড়তে যায়। ছুটি মেলে রাত আটটায়। এরপর আবার বাড়ি ফেরা।
‘তোমার আর ভাইবোন নেই?’
‘একটা ভাই আছে। আমার থেইক্যা বড়। তার নাম বজলু।’
‘তোমার ভাই কি পড়ালেখা করে? স্কুলে যায়?’
‘না, হে পড়ালেখা করে না। কেলাস ফোর পর্যন্ত পড়ছে। কোনো কাইমকাইজও করে না। খালি বন্ধুবান্ধবগো লগে ঘুরে।’
‘তোমার পড়ালেখা করতে ভালো লাগে?’
‘হ, ভালাই লাগে। তয় ইংরাজিটা কডিন লাগে। অনেক সময় কিছু বুজবার পারি না।’
‘বাসায় টেলিভিশন আছে?’
‘হ, আছে। ডিশের লাইনও আছে।’
‘কোন চ্যানেল বেশি দেখো?’
‘সনি চ্যানেলে ভূতের নাটক দেখি বেশি।’
‘আজ সকালে কী নাশতা খেয়েছো?’
‘ও আল্লাহ! কী কন? আমি তো রোজা আছি।’
‘রোজার মাস ছাড়া অন্য সময় সকালে কী দিয়ে নাশতা করো?’
‘বাড়িতে কোনো নাশতা নাই। মা আমারে ১০-১৫ ট্যাকা দেয়। হেই ট্যাকা দিয়া শিঙাড়া-মিঙাড়া এই সব খাই।’
‘শুধু শিঙাড়া খেয়ে পেট ভরে তোমার?’
‘প্যাট ভরে না এইডা ঠিক। কিন্তু কী করুম। মায়ে তো এর থেইক্যা বেশি দিবার পারে না।’
‘ভাতের সঙ্গে কী তরকারি খাও?’
‘শাক, ডাইল এই সব দিয়া ভাত খাই। মাজেমইধ্যে যেসব বাড়ি থেকে ময়লা লই, হেইসব বাড়ি থেইক্যা মুরগির চামড়া, গিলা-কলিজা এই সব দেয়। এইগুলা আমার মা রান্দে। হেই দিয়া ভাত খাই।’
‘তোমার কী খেতে বেশি ইচ্ছা করে’
‘আন্টি আপনারে কই, আমার গরুর মাংস খাইতে খুব মন চায়। কিন্তু মাংসের দাম এত বেশি, আমার মা কিনবার পারে না। হের লাইগ্যা খাইতে পারি না।’
‘সামনে তো ঈদ। ঈদের জামা কিনেছ?’
‘না অহনও কিনি নাই। ঈদের সময় অনেক বাড়ি থেকে মায়েরে বকশিশ দিব। তহন হেই ট্যাকা দিয়া মা আমারে জামা কিন্যা দিব।’
‘ঈদের বাজার কোথায় করো?’
‘শাহজাহানপুর খেলার মাঠের পাশে রেল কলোনির বাজার আছে। ঈদের আগের রাইতে সেইখানে গিয়া পছন্দ কইরা গেঞ্জি-প্যান্ট কিনি।’
‘তোমার মা নিজের জন্য কিছু কেনেন না?’
‘মায়ে তো অনেক শাড়ি পায়। অনেক বাসা থেইক্যা মায়েরে শাড়ি দেয়। হেইগুলাই মা ঈদের দিন পরে। নিজের আর কিনন লাগে না।’
এরপর লোকমান আর দাঁড়ায় না। বলে, ‘অনেক দেরি হইয়া গেছে আন্টি। আপনার লগে পরে কথা কমু।’ এই বলে দৌড়ে চলে যায় ময়লার গাড়ির দিকে।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক।

সৌজন্যেঃ প্রথম আলো-১-৭-২০১৬

মন্তব্য