Gmail! | Yahoo! | Facbook

মহান মে দিবস

FacebookTwitterGoogle+Share

may dayঢাকা, ১ মে ২০১৬ঃ আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে সারা বিশ্বে মে দিবস পালন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমজীবী মানুষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলো সংগঠিতভাবে রাজপথে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি বিশেষভাবে পালন করে থাকে। মে দিবস নিয়ে লিখেছেন আহমেদ ইফতেখার

মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের জন্য বছরের একটি বিশেষ দিন। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে এই দিনটি পালিত হয়ে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১ মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে বেশ গুরুত্বের সাথে পালিত হয়।

ইতিহাস
কারখানা শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। নানা সময়ে অধিকার বঞ্চিত এসব শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবি জানিয়ে এসেছে। ১৮৬০ সাল থেকে এই দাবি একটু একটু করে জোরালো হচ্ছিল। শ্রমিকেরা তাদের অধিকার আদায়ের দাবিতে রাস্তায় নামতে শুরু করে। কিন্তু সাংগঠনিক শক্তি না থাকায় তা সহজেই দমন করতে পারে মুনাফালোভী মালিকপক্ষ। ওই বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন দাসপ্রথা বিলোপের ঘোষণা দিলে দাসমালিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়; যা পরবর্তী সময়ে দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলে এই গৃহযুদ্ধ। ফলে এ সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৮ বছর পর ১৮৭৩ সালে আমেরিকা মন্দার শিকার হয়। এই মন্দা চলে ১৮৭৯ সাল পর্যন্ত। মন্দা কাটিয়ে ওঠার পর দেশটিতে দ্রুত শিল্পোন্নয়ন ঘটে। আর এর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে শিকাগো শহর। কিন্তু কারখানায় কাজের পরিবেশ সেভাবে উন্নত হয়নি। কমেনি শ্রমিক শোষণও। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শোষণের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। ফলে খুব দ্রুত কারখানা শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৮০ সাল থেকেই তারা কারখানার সুস্থ পরিবেশ ও শ্রমঘণ্টা কমানোর দাবি জানাতে থাকে এবং এই দাবি আদায়ের জন্য বিভিন্ন সময়ে ধর্মঘট করে। কিন্তু মালিকপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। ১৮৮১ সালে শ্রমিকদের দাবি ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আমেরিকা ও কানাডায় গঠিত হয় দু’টি শ্রমিক সংগঠন। এই দু’টি সংগঠন বিভিন্ন সময়ে মালিকপক্ষের শোষণ ও অধিক মুনাফালাভের বিষয়টি শ্রমিকদের কাছে স্পষ্ট করে এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৪ সালে দুই দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো একটি প্রস্তাবনা উত্থাপন করে। এতে বলা হয় ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে শ্রমিকদের কর্মদিবস হবে ৮ ঘণ্টা। ৮ ঘণ্টার বেশি কোনো শ্রমিক কাজ করবে না।
দুই দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর এ আহ্বানে শ্রমিকেরা ব্যাপকভাবে সাড়া দেন। কিন্তু মালিক ও সরকার পক্ষ শ্রমিকদের এই প্রস্তাবনায় সাড়া না দিয়ে নির্যাতন-নিপীড়নের পথ বেছে নেয়। এর প্রতিবাদে শ্রমিক সংগঠনগুলো ১৮৮৬ সালের ১ মে, শনিবার শ্রমিকেরা শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে বিশাল সমাবেশের ডাক দেয়। শিকাগো শহরের সাতটি সংগঠনসহ মোট ২২টি শ্রমিক সংগঠন এ দিন মিছিলে করে হে মার্কেটের সামনে সমবেত হতে থাকে। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সাথে সরকার ও মালিক পক্ষের ঐকমত্য হয় না। ফলে আন্দোলন আরো তীব্রতা লাভ করে।
১৮৮৬ সালের ৩ মে, সোমবার শিকাগোর ম্যাককর্মিক রিপার ওয়ার্কসের শ্রমিকেরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে কারখানার বাইরে ধর্মঘট করলে পুলিশ তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে ঘটনাস্থলে ছয়জন শ্রমিক নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরদিন অর্থাৎ ৪ মে, মঙ্গলবার আন্দোলনকারী কারখানা শ্রমিকেরা শিকাগোর হে মার্কেটে জড়ো হতে থাকেন। শহরের বিভিন্ন কারখানা থেকে শ্রমিকেরা মিছিল করে আসতে থাকেন হে মার্কেটের দিকে। অন্য দিকে শ্রমিকদের এই আন্দোলন বানচাল করতে তৎপর হয়ে ওঠে মার্কিন পুলিশ। ওই দিন শ্রমিকদের একটি মিছিল থেকে কেউ একজন পুলিশের ওপর বোমা নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের সাতজন কর্মকর্তা নিহত হন। বিক্ষুব্ধ পুলিশ পাল্টা গুলি চালায় আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ওপর। পুলিশের গুলিতে আন্দোলনকারীদের চারজন নিহত হন। আহত হন আরো অনেকে। বোমা হামলার ঘটনায় হামলাকারীকে শনাক্ত না করা গেলেও সন্দেহভাজন হিসেবে আটজন অ্যানার্কিস্টকে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়।
সুস্থ কর্মপরিবেশ ও কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে একটি প্রস্তাবনা পেশ করা হয়। প্রস্তাবনা পেশ করেন রেমন্ড লাভিনে। সেখানে তিনি ১৮৯০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিকভাবে শিকাগো প্রতিবাদ বার্ষিকী পালনের কথা উল্লেখ করেন। ১৮৯১ সালে তার এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষেরা মে মাসের ১ তারিখ সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশে এটা কার্যকরও হয়। মার্কিন সরকার ১ মে-কে ‘ল ডে’ হিসেবে ঘোষণা দেয়।
শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে কোনো কোনো স্থানে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশের অধিবাসীর কাছে ‘মে দিবস’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে সেসব দেশে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতেও এ দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়।

মে দিবস আসে মে দিবস যায়
প্রতি বছর ১ মে ‘মে দিবস’ বা আন্তর্জাতিক শ্রম-দিবস’ হিসেবে পালতি হয়। এ দিন সরকারি ছুটিও থাকে। বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন শ্রমিক সমাবেশের মাধ্যমে এ দিবসটি উদযাপন করে থাকে। কিন্তু যে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিকেরা আন্দোলন করেছেন, রক্ত দিয়েছেন তা কি সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শ্রম-আইন মানা হলেও অনুন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশেই সঠিকভাবে মানা হয় না। অর্থাৎ শ্রমিকদের বঞ্চনার কথা শুধু ইতিহাসের পাতাতেই থেকে যায়নি বাস্তবেও থেকে গেছে। তা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
বাংলাদেশ লেবার ফোর্সের সার্ভে অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমিকসংখ্যা পাঁচ কোটির কাছাকাছি। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশ মহিলা শ্রমিক। বাংলাদেশের এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতি বছরই মে দিবস পালিত হলেও মূলত তাদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় সব সুবিধা মুনাফাখোর কারখানা মালিকদের পক্ষেই চলে যায়। ফলে মে দিবস আসে মে দিবস যায়- মেহনতি মানুষের ভাগ্য আর বদলায় না।
সরকারের পক্ষ থেকে যে উন্নয়নের কথা শোনা যায় তা শ্রমিকেরই শ্রমের ফসল। আমাদের দেশের শ্রমিকেরা বিভিন্ন সেক্টরে তাদের শ্রম দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও বিশালসংখ্যক শ্রমিক অর্থ উপার্জন করে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। দেশকে সমৃদ্ধ করছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রবাসী এ শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। সেই বঞ্চনার চিত্র ভয়াবহ।
দেশে এখনো শিশুশ্রম বন্ধ করা যায়নি। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে রি-রোলিং ও ইস্পাত কারখানার মতো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কম বেতনে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুশ্রমিকদের। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে তাদের ওপর কখনো চাপানো হচ্ছে ভারী কাজের দায়িত্ব। সেটা করতে না পারলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনও করা হচ্ছে। অমানবিক শারীরিক নির্যাতনে কোনো কোনো শিশুশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। থেমে নেই গৃহপরিচারিকা নির্যাতনও। ফলে যে তাৎপর্য নিয়ে প্রতি বছর মে দিবস ফিরে আসে তা তার পরদিন থেকেই ফিকে হয়ে যেতে থাকে।
আমাদের দেশের শতকরা ৮০ ভাগ কৃষিনির্ভর মানুষ। সেখানেও রয়েছে বঞ্চনার ইতিহাস। কৃষকেরা প্রতি মুহূর্তে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আজো সারের জন্য কৃষকের কণ্ঠে হাহাকার শোনা যায়। পাওয়া যায় সেচপাম্প চালাতে বিদ্যুতের দাবিতে কৃষককে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করার খবর। শুধু তাই না উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত কৃষকসমাজ। অন্য দিকে অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে সাধারণ মানুষকে এসব কৃষিপণ্য কিনতে হচ্ছে উচ্চমূল্যে। বছরের পর বছর এ অবস্থা চলছে। এর কোনো সুরাহা মেলেনি।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা অর্থাৎ খেটেখাওয়া মানুষেরা। তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে কিন্তু আয় বাড়ছে না। ফলে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যে শ্রমিক সমাজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি সেই শ্রমিক সমাজ অনাহারে-অর্ধাহারে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন; যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

মে দিবসে আমাদের প্রত্যাশা
মে দিবসের রক্তাক্ত ইতিহাসের পথ ধরে শ্রমিকদের আটঘণ্টা কর্মঘণ্টার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, মে দিবসের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের সংহতি ও আন্দোলনও মাত্রায় উন্নীত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবের আমেজে মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। সামগ্রিকভাবে বলতে হয়, দেশের শ্রমিক সমাজ খুব ভালো অবস্থায় নেই। তাদের অবস্থার আরো উন্নয়ন প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করতে হলে শিল্পোন্নয়ন ও উৎপাদন যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি শ্রমিক কল্যাণে মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। মালিক ও শ্রমিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক মানবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হলেই কেবল শিল্প-স্বার্থ, মালিক-স্বার্থ ও শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে এ রকম একটি সম্পর্কই আমরা প্রত্যাশা করি। নয়া দিগন্ত

মন্তব্য