Gmail! | Yahoo! | Facbook

নৃশংসতাঃ বাহুবলে মাটিচাপায় নিখোঁজ ৪ স্কুলছাত্রের লাশ

FacebookTwitterGoogle+Share

bahubolঢাকা, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ঃ হবিগঞ্জের বাহুবলে পাঁচ দিন আগে নিখোঁজ হওয়া চার স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা হলোÑ বাহুবল উপজেলার ভাদেস্বর ইউনিয়নের সুন্দ্রাটিকি গ্রামের ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র জাকারিয়া শুভ (৭), একই পরিবারের আবদুল আজিজের ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র তাজেল মিয়া (১০), আব্দাল মিয়ার ছেলে প্রথম শ্রেণীর ছাত্র মনির মিয়া (৬) ও তাদের প্রতিবেশী আব্দুল কাদিরের ছেলে মাদরাসার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ইসমাইল হোসেন। প্রথম তিনটি শিশু আপন চাচাতো ভাই।
গত ১২ ফেব্র“য়ারি শুক্রবার বিকেলে চার শিশু তাদের বাড়ির পাশের মাঠে খেলতে যায়। সন্ধ্যার পরও তারা বাড়িতে না আসায় পরিবারের লোকজন বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। ওই দিন রাতে তাদের সন্ধানে বাহুবলে মাইকিং করা হয়। রাতেই জাকারিয়া শুভর বাবা ওয়াহিদ মিয়া বাহুবল থানায় জিডি করেন। নিখোঁজের পর পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র নিখোঁজ ছাত্রদের সন্ধানদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন। ১৫ ফেব্র“য়ারি সিলেটের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি আক্কাছ উদ্দিন ভূঁইয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বুধবার সকালে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের পাশের একটি বালুর মাঠে চার স্কুলছাত্রের লাশের সন্ধান পান এলাকাবাসী। তাদের লাশ উদ্ধারের সংবাদে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হন। তবে হত্যাকাণ্ডের কোনো মোটিভ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
ঘাতকদের সন্ধানদাতাকে লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা : চার স্কুলছাত্র হত্যাকারীদের সন্ধানদাতাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ। সিলেটের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি ড. আক্কাছ উদ্দিন ভূঁইয়া এ ঘোষণা দেন। হবিগঞ্জ পুলিশের গোয়েন্দা শাখা থেকে শুরু করে জেলার প্রত্যেক থানার চৌকস কর্মকর্তাদের চার স্কুলছাত্র হত্যাকারীদের গ্রেফতারে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তা ছাড়া পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি টিম ইতোমধ্যে ঘাতকদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে। পুলিশের প থেকে অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে ঘাতকদের গ্রেফতারের ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে অনুদান : নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার হওয়া চার স্কুলছাত্রের প্রত্যেকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের প থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম এ ঘোষণা দেন। জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
বিকৃত লাশ : ময়নাতদন্তে বিলম্ব : ধারণা করা হচ্ছে নিখোঁজ করার পরপরই চার স্কুলছাত্রকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয় ঘাতকেরা। পাঁচ দিনের ব্যবধানে লাশগুলো অনেকটাই বিকৃত হয়ে গেছে। পচন ধরেছে শরীরের কিছু অংশে। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ৩টায় লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য হবিগঞ্জ মর্গে আনা হয়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার আবু নাঈম হাসান লাশের ময়নাতদন্ত করছেন। বেলা ৪টায় হাসপাতালে গিয়ে জানা যায় একটি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। অন্যগুলোরও ময়নাতদন্ত কার্যক্রম চলছে। লাশে পচন ধরায় এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় ময়নাতদন্ত কার্যক্রম অনেকটা সতর্কতার সাথে করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালের একটি সূত্র। ফলে ময়নাতদন্ত কার্যক্রমে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
কান্নার রোল : নিহত চার স্কুলছাত্রের পরিবার আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। কারও বাবা দিনমজুর, কারও বাবা নির্মাণশ্রমিক। অস্বচ্ছল এসব পরিবারের চার সন্তানকে একসাথে হত্যা করার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। লাশ দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। লাশ উদ্ধার করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। শুধু সুন্দ্রাটিকি গ্রাম নয়, ভাদেস্বর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
যেখান থেকে লাশ উদ্ধার হয় : হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার ভাদেস্বর ইউনিয়নের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম সুন্দ্রাটিকি। হবিগঞ্জ শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। গ্রামটি অনেকটা পাহাড় ঘেষা। রশিদপুর পাহাড়ের পাশে গ্রামের অবস্থান। পাহাড়ের পাশে রয়েছে স্থানীয় ইছালিয়া হাওর। বাগানের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে ইতোমধ্যে একটি চড়া তৈরি হয়েছে। সেই চড়ার নাম বালুচড়া। গত কয়েক বছর ধরে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির সাথে বালু এসে জমা হয় সেখানে। স্থানীয়রা বিভিন্ন উপায়ে সেই বালু বিক্রিও করেন। বালু নেয়ার ফলে চড়ার কয়েকটি স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বালুচড়াটি চার স্কুলছাত্রের গ্রামের বাড়ি সুন্দ্রাটিকি থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে। পাঁচ দিন নিখোঁজের পর চার স্কুলছাত্রের লাশের সন্ধান মিলেছে সেই বালুচড়ার গর্তে। বালু আহরণকারী ছাড়া সাধারণ মানুষের সেখানে যাতায়াত নেই বললেই চলে। এমন একটি নির্জন স্থানকেই লাশ গুমের স্থান হিসেবে বেছে নেয় ঘাতকেরা।

হবিগঞ্জে ৪ শিশু খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫

হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫ জনকে আটক করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যায় একই এলাকার মাতাব্বর আব্দুল আলী ও তার ছেলে জুয়েলকে আটক করা হয়। পরে বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে মোট পাঁচজনকে আটক করা হয়। আটককৃত বাকি দুইজন হলেন- বাচ্চু ও আরজু। এছাড়া তদন্তের স্বার্থে একজনের নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ। বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেন তাদের ৫ জনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নিহত শিশু মনিরের বাবা আফজাল মিয়া তালুকদারের সাধারণ ডায়রির পরিপ্রেক্ষিতে বাহুবল থানা পুলিশ ও র‌্যাব তাদের আটক করে। এদিকে চার শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসকরা। হবিগঞ্জ জেলা আধুনিক হাসপাতালে নিহত চার শিশুর ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার বিকেল ৪টায় হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. দেবাশিষ দাস ও ডাক্তার আবু নাঈম হাসান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেন জানান, বুধবার সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো তাদের পরিবারের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি জানান, নিহত ৪ শিশুর পরিবারকে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম ও পুলিশ সুপার জয় দেব কুমার ভদ্র লাশ হস্তান্তরের সময় নিহতের পরিবারের হাতে এ অনুদান তুলে দেন।

নয়া দিগন্ত / মানব জমিন

মন্তব্য