Gmail! | Yahoo! | Facbook

কেমন ছিল ওমর রা:-এর শাসন

FacebookTwitterGoogle+Share

mosqueড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান।। হজরত ওমর রা: বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজেতাদের অন্যতমই ছিলেন না, আদর্শ শাসক হিসেবেও তিনি বিশ্ব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ঐতিহাসিক ইমামুদ্দিন বলেন, ‘তাঁর শাসনকাল ইসলামের কৃতিত্বপূর্ণ সামরিক ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজন করেছে। শুধু মহান বিজেতাই নন, তিনি ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক এবং নিরঙ্কুশ সফলকামী জাতীয় নেতাদের অন্যতম।’

সংক্ষিপ্ত পরিচয় : ইসলামি রাষ্ট্রের অন্যতম রূপকার হজরত ওমর রা: ৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশ বংশের আদি গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল খাত্তাব এবং মাতার নাম খানতামা। শিক্ষিত, শক্তিশালী, তেজস্বী এবং মল্লযুদ্ধ বিশারদ হিসেবে অল্প বয়সেই তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। ঐতিহাসিক বালাজুরির মতে, ‘মহানবীর আবির্ভাবের আগে কুরাইশ বংশের মাত্র সতের শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে হজরত ওমর রা: ছিলেন অন্যতম।’ ২৬ বা ২৭ বছর বয়সে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। ২৪ হিজরির ১ মোহররম তিনি ইন্তেকাল করেন। মহানবী সা: তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার পরে যদি কেউ নবী হতেন তাহলে ওমর ইবনুল খাত্তাবই নবী হতেন’ (সুনানে তিরমিজি)।

হজরত ওমর রা:-এর শাসনব্যবস্থা : হজরত ওমর রা: ২৩ জমাদিউস সানি ১৩ হিজরি মোতাবেক ২৪ আগস্ট ৬৩৪ খ্রি. মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। খিলাফত লাভের পর তিনি নিম্নোক্ত ভাষণ দেন : ‘হে আল্লাহ! আমি দুর্বল, আমাকে শক্তি দাও। হে আল্লাহ! আমি রূঢ় মেজাজের অধিকারী, আমাকে কোমলপ্রাণ বানাও। হে আল্লাহ! আমি কৃপণ, আমাকে দানশীল বানাও’ (ইবনে সা‘দ, আত-তাবাকাত)।
খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি শাসনব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। যেমন-

মজলিসে শূরা : হজরত ওমর রা:-এর শাসনপদ্ধতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মজলিসে শূরা। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় মজলিসে শূরার পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হতো। মজলিসে শূরায় বিজ্ঞ ও বিদগ্ধ ব্যক্তিদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হতো। হজরত আলী, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মুআজ ইবনে জাবাল, উবাই ইবনে কাব, জায়েদ ইবনে ছাবেত রা:-এর মতো বিশিষ্ট সাহাবিরা ওমর রা:-এর শূরার সদস্য ছিলেন। সাধারণ জনগণেরও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে মতামত দেয়ার পূর্ণ অধিকার ছিল। তারা সরাসরি কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়া খলিফাকে তাদের মনের কথা বলতে পারতেন।

প্রদেশের সৃষ্টি : আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা একটি পরীক্ষিত বিষয়। ওমর রা: কর্তৃক সৃষ্ট প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও বিচক্ষণতার সাথে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করেন। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা মতে, ওমর রা:-এর খিলাফত মক্কা, মদিনা, সিরিয়া, জাজিরা, বসরা, কুফা, মিসর ও ফিলিস্তিনÑ এই আটটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। আর প্রত্যেকটি প্রদেশ গঠিত হয়েছিল কয়েকটি জেলার সমন্বয়ে। এভাবে তাঁর খিলাফত হয়ে উঠেছিল সুনিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল।

দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ : হজরত ওমর রা: প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে যোগ্যতর লোক নিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং সম্মানজনক বেতনভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। দায়িত্বে নিয়োজিত কেউ যাতে অবৈধ উপার্জন ও ক্ষমতার অসদ্ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য তাদের কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হতো। অসততা প্রমাণে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হতো।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনা : হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলে ভূমি রাজস্ব ছিল অর্থ জোগানের অন্যতম মাধ্যম। ব্যবসায়িক পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক এবং বিজিত অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত অর্থসম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো। দারিদ্র্য বিমোচনে তিনি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। সম্মানিত ও অসহায় নাগরিকদের জন্য বিশেষ ভাতার প্রচলন করেছিলেন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা : ন্যায় ও সুষ্ঠু বিচারের জন্য একটি অতীব প্রয়োজনীয় দিক হচ্ছে আইনের চোখে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু নির্বিশেষে সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়া। বস্তুত যে আদালতে সব শ্রেণীর মানুষের জন্য প্রকৃত সাম্যের ব্যবস্থা নেই, সেখানে সুবিচার না হয়ে বিচারের নামে প্রহসনই হয়। ওমর রা: অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থা কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার এই সদিচ্ছা সর্বতোভাবে কার্যকর হচ্ছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি অনেক সময় বাদি কিংবা বিবাদি বেশে আদালতে উপস্থিত হতেন।

শাস্তি বিধান : প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রতি খলিফা ওমর রা:-এর সাধারণ নির্দেশ ছিলÑ হজের সময় সবাই যেন মক্কায় উপস্থিত হয়। অপর দিকে বিপুলসংখ্যক লোক হজ উপলক্ষে মক্কায় সমবেত হতো। খলিফা নিজে জনসাধারণের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতেন, ‘কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে কারো কোনো অভিযোগ থাকলে বলতে পারেন।’ এই ঘোষণার ফলে লোকজন সামান্য অভিযোগও তাঁর কাছে উপস্থাপন করত। ওমর রা: সূক্ষ্ম বিবেচনার সাথে-এর প্রতিকার করতেন।

তদন্ত বিভাগ : কখনো কখনো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসত তা তদন্তের জন্য খলিফা ওমর রা: একটি নতুন পদের সৃষ্টি করেন এবং মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা আনসারীকে এই পদে নিয়োগ দেন। তিনি কোনো অভিযোগ পেলে স্পটে চলে যেতেন এবং লোকজনের কাছ থেকে অভিযোগ শ্রবণকরত: সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করে খলিফার কাছে রিপোর্ট পেশ করতেন।

তদন্ত কমিশন : ওমর রা: সুষ্ঠু বিচারের লক্ষ্যে কোনো কোনো ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট নিশ্চিত করার জন্য একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিশন গঠন করেন। এরূপ অসংখ্য ঘটনা ইতিহাসে উল্লিখিত হয়েছে। কখনো কখনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে খলিফার দফতরে তলব করা হতো। সাধারণত প্রাদেশিক গভর্নর পর্যায়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যাপারেই এরূপ করা হতো।

সম্পদের হিসাব গ্রহণ : ওমর রা:-এর সময় কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী নিয়োগকালে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করে খলিফার দফতরে সযত্নে সংরক্ষণ করা হতো। অতঃপর কারো সম্পদে অস্বাভাবিক উন্নতি দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো।

সুবিচারের দৃষ্টান্ত : ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ এই বিধান কথায় নয়, কাজে পরিণত করা হয়েছিল। তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালনের ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করতেন না। দণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে তিনি তাঁর ছেলেকে মেরেই ফেলেছিলেন।

জনসংখ্যানুপাতে আদালত : ওমর রা: রাষ্ট্রের সর্বত্র জনসংখ্যানুপাতে বিপুলসংখ্যক আদালত প্রতিষ্ঠা ও বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। দেশের এমন কোনো জনপদ ছিল না যেখানে অন্তত একজন বিচারক ছিলেন না। অমুসলিমদের জন্য তাদের ধর্মীয় আইনসম্মত বিচারকাজ পরিচালনার জন্য পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। কাজেই তাদের বিচার ইসলামি আদালতে খুব কমই দায়ের করা হতো।
ফতোওয়া বিভাগ : বিচারকাজ কার্যকর করার ক্ষেত্রে ফতোওয়া বিভাগের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই বিভাগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড : হজরত ওমর রা:-এর সময় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল। ভূমি ব্যবস্থার সংস্করণ, খাল-জলাধার খনন ও সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রাস্তা নির্মাণ, গৃহ নির্মাণ ও বসতি স্থাপন এবং নতুন নতুন নগর ও শহরের সৃষ্টি ছিল তার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য দিক।

উপসংহার : হজরত ওমর রা:-এর শাসনব্যবস্থা ছিল সব ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক। সব বিষয়েই খলিফা নিজেকে মনে করতেন জবাবদিহিতার মুখাপেক্ষী। শাসনব্যবস্থা ছিল মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রশাসনিক সব প্রতিষ্ঠান ছিল সুসংগঠিত ও সুবিন্যস্ত। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়-
অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি
খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি
সাইমুম ঝড়ে পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে,
ঊর্ধ্বে যারা- পড়ছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে।
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ
করেছে ছালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ।
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে।
লেখক : গবেষক

নয়া দিগন্ত-২৮ জানুয়ারি ২০১৬।

মন্তব্য