Gmail! | Yahoo! | Facbook

বাংলা ভাষা শঙ্খনাদ অতল সাগরে

FacebookTwitterGoogle+Share

water paintজু বা ই দা গু ল শা ন আ রা।। মানুষের জীবনে ভাষার গুরুত্ব কত গভীর তা আমরা সবাই জানি। ভাষা হচ্ছে মানুষের ঐতিহ্য ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের বাহন। ভাষা মূলত জীবনের শিকড় ও ইতিহাসের আত্মাস্বরূপ। বাংলা ভাষার মূল পরিচয়, উত্থান ও সৃষ্টির আদি রূপ খুঁজতে গেলে দেখা যায়, প্রাচীন ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার দীর্ঘ বিবর্তিত ও পরিবর্তিত রূপই আজকের বাংলা ভাষা। এ ভাষার পূর্ব ইতিহাস খুঁজতে গেলে জানা যায় ইউরোপীয় নৃগোষ্ঠীর আর্য ভাষাভাষীরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। আর্যদের ব্যবহৃত সংস্কৃত ভাষার প্রভাব প্রাচীনকালে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংস্কৃত ভাষার যে মার্জিত সাহিত্যগুণ তার প্রভাবও সমসাময়িক ভাষায় লক্ষ করা যায়। এর ফলে লোকজীবনে প্রচলিত কথ্যভাষা ও আর্য সংস্কৃত ভাষায় সঙ্ঘাত সৃষ্টি হয়। প্রাকৃত ভাষা পরিবর্তিত হয়ে সৃষ্টি হয় মাগধি প্রাকৃত বা পূর্বীপ্রাচ্য ভাষার। তার ফলে আবার ক্রমেই পরিবর্তন ঘটে ও সৃষ্টি হয় অপভ্রংশ ভাষার। একই সময় সৃষ্টি হয় স্তর ভেদে অসমিয়া, উড়িয়া, ভোজপুরী বিহারি ও মৈথিলি ভাষার।
দশম থেকে দ্বাদশ শতকে সৃষ্টি প্রাচীন চর্যাপদের তিনটি পুঁথি বিশ শতকের প্রথম দশকে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার করেন পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে প্রাচীন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পুঁথি উদ্ধার হয়। বাংলা ভাষার এই পুঁথি রচনা করেছিলেন বড়ু চণ্ডীদাস কবি। মানুষের ভাষা বহতা নদীর মতো যুগ থেকে যুগে সময়ের সঙ্গী।
যেমন বলতে পারি, বাংলা ভাষা সমুদ্রের গাঢ় উন্মাতাল কল্লোলের সঙ্গে ইতিহাসকে সঙ্গী করে তার সৃজনশীলতার পথে যাত্রা করেছে। সভ্যতার বিভিন্ন শাখায় চলতে চলতে সঙ্কট ও সংশয় বারবার যেখানে বাধা হতে পারে। তবুও প্রগাঢ় কৌতূহল নিয়ে তার দীর্ঘকাল পরে মূল চর্যাপদ ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রাচীন ভাষার সঙ্গে যাত্রা করেছিল। মূলত সাহিত্য তার পথ সন্ধান করেছিল ধর্মীয় অনুভব ও ভক্তিরসের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ পদযাত্রায় তার বিচিত্র বিষয় নিয়ে মানবজীবনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অবস্থা নিয়ে সব ধরনের দায়িত্ব পালন করে গেছে। একসময়ে রাজ্য ও রাজার রক্তস্নাত যুদ্ধ যেমন গোটা ভারতীয় উপমহাদেশকে ঘটনার প্রচণ্ড বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল; তেমনই দেশী ও বিদেশী ভাষা, ধর্মীয় অনুভব থেকে লেখা পুঁথির বিশাল এক জগৎও গড়ে ওঠে ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের ব্যাপ্তিতে। তা ছাড়াও পুঁথির আধ্যাত্ম অনুভবের মধ্যে ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় তৈরি হয় সুফি মতবাদ চর্চা। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন ধারার সৃজনশীলতা, কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বহুমুখী সাহিত্যচর্চা ও গবেষণাধর্মী জ্ঞানসাধনাÑ যার বিশালতা লক্ষ করা যায় বাঙালির আত্মানুসন্ধানে। সব দেশের ইতিহাসেই এমনটি ঘটে থাকে। বাংলা সাহিত্য ও ভাষা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সেভাবে নানা ভাবের পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটেছে। বাংলাদেশ অর্থাৎ বৃহৎ বঙ্গের ওপরে নানা দেশের নানা ইতিহাসের প্রভাব লক্ষ করা যায়। দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে এ দেশে যে চর্যাপদের বিস্ময়কর ধর্মকেন্দ্রিক কাব্যচর্চা প্রচলিত ছিল, তার ভাষা ছিল নিজস্ব ও বিস্ময়কর। ধর্মীয় অনুভবের ভাষায় লেখা যে আড়াল ছিল তার মধ্য দিয়ে ক্রমেই গীতপ্রবণ ও সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চেতনা ও জীবনকেই তুলে ধরে। অর্থাৎ ধর্মকেন্দ্রিকতার পাশাপাশি গভীর জীবনচর্চার জীবনস্রোত। এ কথা সত্যি যে, সব ভাষারই তার নিজস্ব গতি ও ভাব প্রকাশের কাঠামো থাকে। বাংলা ভাষায় নানামুখী চর্চা সুদূর অতীত থেকে শুরু করে নানা ধর্মলোকজীবনে এ দেশে এসেছে। প্রশাসন, বাইরের আগ্রাসন, বিদেশী রাজন্যবর্গ ও পর্যটকেরা সারা বিশ্ব থেকে এ দেশে এসেছেন এবং মোগল ও পাঠানদের শাসনকালীন নানা বিদেশী প্রভাবে পুষ্ট হয় এ দেশের সাহিত্যভাবনা। ইংরেজরা এ দেশে আসার পরে বদলে যায় ভাষার পরিচয়। ইতঃপূর্বে পাঠান রাজাদের সময়ে বাংলাদেশে ভাষা ও সাহিত্যচর্চা ছিল এক বহমান নদীর মতো। তা ছিল অনুকূল পরিবেশে বৈচিত্র্যময় সৃজনশীলতায় পূর্ণ। মোগল ও পাঠান রাজত্বে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তারা এ দেশের জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এতে ষোড়শ শতাব্দী ও তার পরের সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি ছিল সহনশীল ও সৃষ্টিশীল। তবে ইংরেজদের এ দেশে আগমনের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অনিবার্য অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ভাবলে অবাক লাগে যে, অতি প্রাচীনকাল থেকে কত ভিন্ন ভিন্ন বহিরাগত সভ্যতাও ভাষার সঙ্গে পরিচয়ের ফলে এ দেশের জীবন কতভাবেই না গভীর আত্মীয়তা গড়ে তুলেছে। সে আত্মীয়তা বাংলার বিশাল নদী, দিগন্তবিস্তৃত কৃষিভূমি নিয়ে। অন্য দিকে বনভূমি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড দেশের পরিচয়ের ক্ষেত্রে বিচিত্র পরিবেশ ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে। নদী-নালা,খাল-বিল ছাড়াও দিগন্তস্পর্শী সমুদ্র ছিল জনজীবনের প্রতিবেশী। তাই বিশাল মাতৃভূমি বাংলাদেশ প্রকৃতির পাশাপাশি তার বিচিত্র জীবনজড়ে শক্তি ও অনুভূতির বন্ধনে আবদ্ধ।
এত বিস্তৃত পটভূমির মধ্যে যে জাতির জন্ম, তার সুদীর্ঘ ইতিহাস আমাদের বিশাল সঞ্চয়। ভেবে দেখেছি, প্রতিটি বিদেশী শক্তির আসা-যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনও পরিবর্তিত হয়। যেমনটা হয়েছে পশ্চিমা শাসকদের শাসনকালে ব্রিটিশ, ফরাসি ও ওলন্দাজ আগ্রাসনের ফলে আমরা মোটামুটি বিশ্বরাজনীতির সদস্য হয়ে উঠি। ব্রিটিশ রাজত্বের একটা বড় অংশ আমাদের দেশে কঠিন শৃঙ্খলের অবরোধ সৃষ্টি করেছিল। দফতরের ভাষা যা আগে ছিল ফারসি, তার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা হলো দরবারের ভাষা।
দীর্ঘ দুই শ’ বছরের সে গোলামি ছিল দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত। তবে একসময়ে নিজেদের প্রয়োজনে ইংরেজরা গড়ে তোলে শিক্ষার আয়োজন। অনুগত শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার জন্য স্থাপন করা হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। এসব চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় শিক্ষা ও সাহিত্য নিয়ে তৈরি বশংবদ এলিট-সমাজ।
কিন্তু বহিরাগত শক্তির কঠোর ও সবল প্রয়োগে ইংরেজ প্রভুদের বিরুদ্ধে একসময়ে বিদ্রোহ শুরু হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর তিক্তুব্ধ জনজীবনে বিদেশী প্রভুদের উৎখাত করার বহু চেষ্টা শুরু হয়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার করুণ মৃত্যু ও ভয়াবহ পরিণাম এ দেশের মানুষকে ুব্ধ ও ব্যথিত করে। দিনের পর দিন সিপাহি বিদ্রোহ, তিতুমীরের সঙ্গে ইংরেজ প্রভুদের যুদ্ধ স্বাধীনতা না আনতে পারলেও বারবার ফিরে ফিরে ঘটতে থাকে বৈরিতা। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বাংলাদেশের মানুষ বারবার বিদেশী প্রভুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। নীল বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফকির মজনু শাহ ও অন্যান্য বিদ্রোহ নানাভাবে স্বাধীনতার চেষ্টায় ভূমিকা রাখে। ওই সময়ে এক দিকে দাস্য সুখে নিমজ্জিত সম্ভ্রান্ত জনগোষ্ঠী, অন্য দিকে লজ্জাজনক বিশ্বাসঘাতক প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ক্রমেই গড়ে ওঠে প্রকৃত স্বাধীনতার তীব্র আকাক্সা।
এমনিতেই তো জীবনের মুখোমুখি টিকে থাকা, সত্য ও সততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে মানুষ রাজনৈতিক জটিলতার শিকার হয়ে পড়ছিল। ফলে ক্রমেই কান্ত-বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিচিত্র বৈপরীত্য ও সঙ্কট প্রতিদিনের যুদ্ধকে কঠিন করে তোলে। দশকের পর দশক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই দেশ তার আপন অস্তিত্বকে, আপন পরিচয়কে খুঁজে ফিরেছে। ভাবতে গেলে সানন্দ বিস্ময়ে দেখি, নিজের অজান্তেই সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সার শক্তি রূপে ভাষাকে আবিষ্কার করেছে। খুঁজে পেয়েছে বাঙালি সত্তার তৃষ্ণা। কত বিচিত্র তার রূপ! গর্বিত হৃদয়ে ভেবে দেখি, ভাষার লড়াই শুধু এই ুদ্র দেশটিকে এনে দিয়েছে মাতৃভাষার রক্তস্নাত বিজয় অর্জনের সম্মান। শুধু তা-ই নয়, সারা বিশ্বের জন্য একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্থান দিয়েছে। আমাদের ফিরে ফিরে সেই দিনটির সামনে শহীদ দিবসের গর্বিত স্মৃতি নিয়ে সেই ভাষার কাছেই ফিরতে হয়, যে ভাষা আমাদের শহীদের রক্তরঞ্জিত স্মৃতিধন্য ভাষার অনাদিকালের শঙ্খধবনির কাছে দাঁড়াতে বারবার আহ্বান জানায়। যেমন সমুদ্রের ঢেউ বিশাল আহ্বান নিয়ে নিরন্তর ফিরে ফিরে আসে আর নিঃসঙ্গ ফিরে যায় সাগরে। প্রকৃত আকর্ষণ মানুষের আত্মার সঙ্গে পরিচয় ঘটে সময়ের প্রয়োজনে।
ধর্মীয় চিন্তার চর্চা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পরিচয়ের ক্ষেত্রে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। আমাদের বাংলা ভাষার আত্মার সৌন্দর্য, মানুষের প্রতি মমতা গীতি, কবিতা, সাহিত্য ছুঁয়ে ছুঁয়ে গড়ে উঠেছে। আউল-বাউল আর পথে পথে বৈরাগীদের একতারা-দোতারার সুরে বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা কান্নার সঙ্গে স্রষ্টার আত্মীয়তা। এরই মধ্যে আমার বাংলা ভাষার বিশাল ইতিহাস। আমার বাংলার নদী, সুনীল আকাশ, বিস্তৃত চিত্রাবলির নয়নভোলানো আবেশে কী এক অনির্বচনীয় মুগ্ধতা রয়েছে, যাকে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন বলে মনে হয়।
সকালের জেগে ওঠা বাতাসের স্নিগ্ধমাধুর্য, মধ্যাহ্নের উদাসনিঃসঙ্গতা, অপরাহ্নের চঞ্চল পাখিদের কণ্ঠস্বর থেকে যখন জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন যথার্থই মনে পড়ে শত ঘৃণা, মৃত্যু, রক্তশ্রোত পেরিয়েও প্রকৃতির বিশালতা ও মানবতা হৃদয় দিয়ে বোঝার বিষয়। সে কারণেই ভাবতে হয়, আমার জীবন ধন্য। আমরা যেন তার যোগ্য হয়ে উঠতে পারি। যা অর্জন করেছি তাকে যেন রক্ষা করতে পারি অন্যায়ের অপঘাত ও অভিঘাত থেকে। সমুদ্রের শঙ্খনাদ যেন আমার অনুভবকে দেয় চিরকালের অমরতা।

নয়া দিগন্ত- ২০/১১/২০১৫

মন্তব্য