Gmail! | Yahoo! | Facbook

মোমিনের ঘর মোমিনের জান্নাত

FacebookTwitterGoogle+Share

houseসৈয়দ শামছুল হুদা।। জগৎ সংসারে বিচিত্র মানুষের জীবনযাত্রায় কে খুশি আর কে অখুশি, কে দুঃখী আর কে সুখী বোঝা বড় দায়। মানুষের বাহ্যিক রূপ-যশ, খ্যাতি দেখে এটা পরিমাপ করার কোনো উপায় নেই যে, লোকটি কী আসলেই সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন, না বুক ভরা হাহাকার সবসময় তাকে তাড়া করে ফিরছে। জগতে মানুষ চেনা বড় দায়। কিন্তু এর মাঝেও ব্যতিক্রম আছে। কিছু লোক আছেন, যাদের দেখলে এটা অনুভব করা যায়, তিনি হয়তোবা সুখেই আছেন। সুখী মানুষের চেহারায় কিছুটা এমন নিদর্শন ফুটে ওঠে। একজন আল্লাহওয়ালা মানুষ যখন সত্যিই দ্বীনের পথে অবিচল থেকে তার প্রেম আর রাসুল (সা.) এর ভালোবাসা অন্তরে লালন করে দিনাতিপাত করেন, তখন তার কাজেকর্মে এটি প্রতীয়মান হয় যে, তিনি সুখে আছেন। কোনো পেরেশানি, বেদনা, দুঃখ-ক্লেশ তাকে তাড়া করে ফেরে না। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘মোমিনের অবস্থা কতই না সুন্দর, যখন সে খুশি হয় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, অখুশি হলে সবর করে। উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর।’

সুখ এবং সচ্ছলতা একসঙ্গে চলতে খুব একটা দেখা যায় না। কিছু মানুষ সুখে আছেন; কিন্তু তারা সচ্ছল নয়। খুব কম মানুষই সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করেন। কিন্তু কিছু মানুষ পরম সুখে, দিনাতিপাত করেন, তাদের চেহারায়, অঙ্গভঙ্গিতে, চাহনীতে, চলাফেরায় এমন ভাব ফুটে ওঠে যে, তাদের দেখলে কিছু মানুষের ঈর্ষা হয়। এমন কেন হয়? কারণ সুখ এবং সচ্ছলতা দুইটি ভিন্ন জিনিস। সুখের সম্পর্ক মনের সঙ্গে, আত্মার সঙ্গে। আর সচ্ছলতার সম্পর্ক সম্পদ আর প্রাচুর্যের সঙ্গে। এ দুইটি জিনিস শুধু সুখ নিয়েই আসে না, মানুষের জীবনে নিরাপত্তাহীনতা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ, আক্রোশ, হিংসা এগুলোও নিয়ে আসে। ফলে একজন সম্পদশালী মানেই সুখী মানুষ নন।

আমরা যদি একজন মোমিন মানুষের জীবনযাত্রা বিশ্লেষণ ও গভীরভাবে অনুধাবন করি, তাহলে দেখব, পরম সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে তার দিন চলছে। একজন মোমিন মানুষ সব ধরনের দাসত্ব থেকে মুক্ত। তার ঘরে হয়তো অঢেল সম্পদ নেই। বিলাসী পণ্যের সমাহার নেই, ভোগ্য উপকরণের জৌলুস নেই। কিন্তু পরম সুখে জীবনযাপন বলতে যা বোঝায় সব উপকরণ তার মধ্যে বিদ্যমান। একজন মোমিন কখনও অন্যের ক্ষতি করে না, কাউকে গালি দেয় না, কাউকে কোনো ধরনের কষ্ট দেয় না, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে লুটে নেয় না, সে কোনো মানুষের গোলামি করে না, তার মধ্যে বিকৃত লোভ উথলে ওঠে না, ফলে তার কোনো শত্রু থাকে না। সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার পেরেশানি থাকে না। চেহারায় উৎকটভাবে বিষণ্ন্নতার নিদর্শনও দেখা যায় না।

ইসলাম মানুষকে এমনই এক সাধারণ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে, যা অনুশীলন করে যে কোনো তুচ্ছ মানুষও মহান আল্লাহর কাছে অনেক সম্মানিত হয়ে উঠতে পারেন। ইসলামে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে এমনই এক ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা দিয়েছে, যা অনুসরণ করলে এককভাবে খুব বেশি অর্থসম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ নেই। দুঃখী মানুষের সমাহার রেখে কারও এককভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠার সুযোগ সীমিত। সচ্ছলতা যদি একজন মোমিনের পদচুম্বন করে তাহলে সেটা হলো সোনায় সোহাগা। কারণ সে তার সম্পদকেও মহান রবের সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় করেন, ফলে সে মানুষের কাছেও প্রিয় হয়ে ওঠেন। সে ব্যক্তিটি মহান রবের কাছেও প্রিয়, সব সৃষ্টির কাছেও প্রিয়।

একজন ঈমানদারের ঘরই হয়ে ওঠে তার জান্নাত। তার সুখের পরম ঠিকানা। একজন মোমিন তার থাকার জায়গাটি এমন সুন্দরভাবে গড়ে তোলেন, যেখানে সুখের অনাবিল ধারা এমনিতেই নেমে আসে। একজন মোমিনের ঘরে আলো জ্বলে উঠে রাতের শেষ প্রহরে। অপরদিকে একজনের ঈমান নেই অথচ সে সচ্ছল, তার ঘুম ভাঙে বেলা ওঠার অনেক পর। একজন মোমিনের ঘর পবিত্র কোরআনের সুরের মূর্ছনায় মোহিত হয়ে ওঠে। কিন্তু একজন অভিজাত মানুষের ঘরে হারমোনিয়ামের সুর বেজে ওঠে। একজন মোমিনের ঘরে তার সন্তান-সন্ততি খুব সামান্য আহার পেলেই মহান রবের শুকরিয়াস্বরূপ বলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’। অপরদিকে একজন সচ্ছল মানুষের মুখে ঘি দিয়ে ভাজা রুটিও গেলানো যায় না, তার এটা পছন্দ না, ওটা পছন্দ না। একজন মোমিনের ঘরে সন্তানের পড়ার টেবিলে থাকে পবিত্র কোরআন, থাকে জায়নামাজ। অপরদিকে কোনো কোনো অভিজাত মানুষের সন্তানের ঘরে পড়ার টেবিলে থাকে একটি বিকৃত রুচির অশ্লীল প্রচারে ব্যস্ত একটি বাঙ্রে রিমোট কন্ট্রোল। এক টিপেই সে চলে যায় এক জগৎ থেকে আরেক জগতে। পরকালের জবাবদিহিতার ভয়ে যে সবসময় তটস্থ, তার বান্দাকে ভয় করার সময় কোথায়? সুতরাং ইহকাল তার শত কষ্টের ভেতর দিয়ে হলেও পরম সুখেই দিনাতিপাত করে। সেই সুখের জীবন সবারই কাম্য। সুতরাং মোমিনের ঘরই মোমিনের জান্নাত। সুখের ঠিকানা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মোত্তাকিদের জন্য আদর্শস্বরূপ কর।’ (সূরা ফোরকান : ৭৪)

অনেক আল্লাহওয়ালা মানুষ আমাদের আশপাশে আছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই সুখী। তারা অল্পতে তুষ্ট। একজন মোমিন কারও উপকার করতে না পারলেও কোনো ক্ষতি তার দ্বারা হয় না। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃত মুসলিম সেই, যার হাত ও মুখের অনিষ্ট থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ।’ (বোখারি)।

মোমিন তার ঘরকে জান্নাতের টুকরা মনে করে। দুনিয়াতে চলতে হলে যতটুকু তার প্রয়োজন, ততটুকুর জন্য ঈমানদার ফিকির করেন, বাকি সময়টুকু ইবাদতে কাটিয়ে দেন। সন্তানদের এমনভাবেই গড়ে তোলেন, যাতে তারা অল্পতে তুষ্ট। তাদের মাঝে দ্বীনি তালিম এমনভাবে ছড়িয়ে দেন, সবাই যেন জান্নাতের একখ- টুকরো। আসুন, আমরা আমাদের ঘর, থাকার জায়গাটি ইহকালেই জান্নাতের অংশ বানাই। আলোকিত বাংলাদেশ

মন্তব্য