Gmail! | Yahoo! | Facbook

কবি ফররুখ আহমদের অভিমান

FacebookTwitterGoogle+Share

poet-Farrukh-Ahmadঅধ্যাপক আশরাফ জামান।। মাইকেল-রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী অন্যতম কবি ফররুখ আহমদ মাত্র ছাপ্পান্ন বৎসর বয়সে ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর আমাদের কাছ থেকে অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলেন। যিনি তার কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও নাটকে তুলে ধরেছেন শ্রমিক-মজুর, মেহনতি মানুষের দুঃখ, বেদনার কথা, তাদের উপর উপরতলার মানুষের নির্যাতনের কথা। সা¤্রাজ্যবাদের শোষণ-বঞ্চনা আর জুলুমের কথা। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মার্জিত পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও কবির জীবনের শেষ সময়গুলো কেটেছে দুর্বিষহ অসচ্ছলতা ও অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে। তার চিকিৎসক বলেছেন, ‘ফররুখ আহমদ ঠিকমতো চিকিৎসা, ওষুধ ও পথ্য পেলে আরো কিছুদিন জীবিত থাকতেন।’
পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায়, যুগে যুগে অনেক দেশেই সে দেশের দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিকগণ শাসক বা প্রভাবশালীদের কাছ থেকে পেয়েছেন অনাদর, অবহেলা আর হয়েছেন নিগৃহীত। তারা অত্যাচার-নিপীড়নের হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ, আর সে দেশের মানুষের জন্য সৃষ্টি করে গেছেন অমৃত। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, পারস্যের কবি ফেরদৌসি, বাংলা সাহিত্যের কবি গোবিন্দ দাস, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি ফররুখ আহমদসহ অসংখ্য গুণী ব্যক্তিত্ব এরূপ।
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টান ধর্মগ্রহণ করে পৈতৃক অর্থসম্পদ থেকে বঞ্চিত হন। যার ফলে তার জীবনে নেমে আসে চরম অভাব-দৈন্য। তার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসারের ও ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ হয়নি। যে মানুষটি এক সময় অহঙ্কার করে বলতেন, চল্লিশ হাজার টাকার কমে ভদ্রভাবে জীবন যাপন করা যায় না, সে মানুষটা সামান্য এক দাতব্য চিকিৎসালয়ে ওষুধ-পথ্যহীন অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। ত্রিশোত্তর কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী দুঃখ করে বলেছেন, ঘরে তিন আনা পয়সা ছিল না যা দিয়ে ট্রামে চড়ে স্বামীর বন্ধু সুভাস মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি যাবেন খবরটা জানাতে। যদিও তার মরদেহ সোনার পালঙ্কে করে চিতায় নিয়ে যাওয়া হয় সৎকারের উদ্দেশ্যে।
অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেছেন : ফররুখ আহমদ সম্পর্কে আমরা বলতে চাই যে, তাঁর ভাবাদর্শ যাই থাক না কেন তিনি কখনও কারো কাছে কোনো অনুগ্রহ গ্রহণ করেননি। এমনকি রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহও তিনি গ্রহণ করেননি। এমনকি পাকিস্তান আমলে সরকার তাকেে য সব সম্মাননা প্রদান করেছেন তিনি নিজে তা কখনও গ্রহণ করেননি। তার বাড়িতে এসে কেন্দ্রীয় সরকারের একজন সচিব সে সম্মাননা তাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি কখনো আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সফরসঙ্গী হননি। তিনি বারবার আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও দেশের বাইরে এমনকি পশ্চিম পাকিস্তান সফরেও যাননি। কারো কোনোরূপ অনুগ্রহ বা পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করেননি। এই দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ সমাজে অতিশয় বিরল।
আত্মবিশ্বাসী কবি ফররুখ আহমদ তাঁর সৃষ্টিকর্মে ছিলেন নিষ্ঠাবান। সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে একাগ্রতা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। কিন্তু প্রচার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে কারো সহযোগিতা বা সাহায্য প্রাপ্তির ধার তিনি ধারতেন না। তাই দেখা যায় তিনি জীবিতকালে অর্ধশতাধিক বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ রচনা করলেও প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ১৪টি। অন্যদিকে তার মৃত্যুর পর চব্বিশটির অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত ও পুনঃ প্রকাশিত হয়েছে।
॥ দুই ॥
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন আদর্শবাদী লেখক। এ ব্যাপারে কারো সঙ্গে কোন আপস করেননি কোনো দিন। তবে এ দেশের কিছু সংখ্যক লেখক ও বুদ্ধিজীবীর কাছে তিনি অপ্রিয় ছিলেন। কারণ সেসব লেখক তার অসাধারণ প্রতিভার কাছে ছিলেন ম্লান ও নিষ্প্রভ। নিছক ঈর্ষাবশত সুযোগ পেলেই তারা কবির ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার চেষ্টা করতেন। কবি পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে দুঃখ করে বলতেন, আমার লেখা ঢাকায় পত্রিকার সম্পাদক সাহেবরা প্রকাশ করেন না, প্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকার সম্পাদকরা।
ফররুখ আহমদের কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে ফররুখ গবেষক অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান বলেছেন, ‘ফররুখ আহমদের বিভিন্ন কাব্য-কবিতায় এ সার্বজনীনতা ও চিরন্তনের অবিনাসী সুর প্রতিষ্ঠিত। এসব মানবতার এ সুর আধ্যাত্মিকতার দেশাত্মবোধে পূর্ণ। এসুর নবজাগরণ ও নিপীড়িত, লাঞ্ছিত ভাগ্যাহত মানুষের মুক্তির সংবাদে পূর্ণ। ফররুখ প্রতিভা তাই যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি কালজয়ী।’
ফররুখ গবেষক ড. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন : ‘আত্মপ্রতিষ্ঠার কামনায় উদ্বেল ত্রিশোত্তরকালের নবজাগ্রত মুসলমানদের জন্য অতীত জীবন, সমুদ্রের মহাকাল্লোল ধ্বনি বহন করে যেদিন সাতসাগরের মাঝি কাব্য আত্মপ্রকাশ করে ছিল সেদিনই বাংলাকাব্যের ইতিহাসে বড় তাৎপর্যপূর্ণ। এমন বলিষ্ঠ কণ্ঠে ও প্রত্যয়দীপ্ত সুরে আর কোনো কবিই কোনোদিন বাঙালি মুসলমানদের আহ্বান করেননি জীবনের সমুদ্রবেলায়। ইতিপূর্বে নজরুলের জাগরণী গানে মুসলমানদের জড়তা কেটে এসেছিল, ফররুখ এবার তাদের উদ্বুদ্ধ করলেন কর্মের পথে, সাধনার পথে, বলিষ্ঠ পদক্ষেপে অগ্রসর হতে।’
কবি ফররুখ আহমদ রোমান্টিক কবি। তার লেখায় ফুটে উঠেছে প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য আকাশ-নক্ষত্র, বন-বনানী, নদী-সমুদ্র, বক্ষ-বনানী, ঝড়-ঝঞ্ঝা, ফুল-পাখী, দিগন্ত  ধু-ধু মরুভূমি, জীব-জানোয়ারের কথা। কবি কল্পনায় ফুটে উঠেছে রূপক, প্রতীক, উপমা বাক কল্পে। তার লেখার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের কথা।
রোমান্টিক কবিরা হলেন স্বপ্নচারী। কবি ফররুখ আহমদ স্বপ্ন দেখেছিলেন মানুষের মুক্তির, শোষিত-নিপীড়িত মানুষের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার। মধ্যযুগের কবি চন্দীদাস সে স্বপ্ন দেখেছিলেন :
শুনছ মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় :
আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা
কপট রাত্রিচ্ছায়ে হেনেছে নিঃসহায়ে
আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে  কাঁদে।
কবি ফররুখ আহমদের কলমে ফুটে  উঠলো সেই মুক্তির কথা :
তোমার শৃঙ্খলাগত মাংসপি-ে পদাঘাতহানি নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বার প্রান্তে টানি
আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীন নিখিলের অভিশাপবও ধ্বংস হও
তুমি ধ্বংস হও। (লাশ)
॥ তিন ॥
ফররুখ আহমদ ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি, সমাজসচেতন কবি। অত্যাচারিত-নিপীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষের কবি। তার লেখার মুসলিম জনতার কথা শুধু নয়, সকল জাতি ও গণমানুষের কথা ফুটে উঠেছে। তিনি গান লিখেছেন :
মাটির মানুষ মাঠের মানুষ
ঘরের মানুষ আর
এই দুনিয়ায় সবার সাথে সমান অধিকার।
কবি আরো লিখেছেন :
গরীবের তাজা বুকের লহুতে ইত্যাদি।
কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন : ‘ইংরেজি রোমান্টিক কবিকুল তার মন হরন করেছিলেন। তার কণ্ঠে যখন তখন ধ্বনিও হতো শেলি, কিটসের অবিনাশী পঙক্তিমালা। যখন তিনি আবৃত্তি করতেন, তার দীর্ঘ এলোমেলো চুল নেমে আসতো কপালে, ধারালো উজ্জ্বল চোখ হয়ে উঠত উজ্জ্বলতর। তার আরেকটি প্রিয় প্রসঙ্গ ছিল মধুসূদন দত্তের কবিতা। মধুসূদনের কথা বলতে গেলে তার কণ্ঠে বেজে উঠত অন্যরকম সুর। মধুসূদনের কবিতা অনর্গল মুখস্থ বলে যেতে পারতেন তিনি।’
ফররুখ আহমদ পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিপ্লবী কর্মী ছিলেন। ১৯৪৫-৪৬ সালের দিকে তখন কলকাতা, ঢাকা ও অন্যান্য শহরে বের হতো পাকিস্তান আন্দোলনকারী নেতা-কর্মীদের জঙ্গি মিছিল। তখন মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের মুখে একটি জনপ্রিয় স্লোগান- ‘ছিল লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, দ্বীনকে লেঙ্গে পাকিস্তান’। এ স্লোগানটি নিয়ে কবি একটি গান লিখে দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় প্রকাশের জন্য দিলেন। তখন দৈনিক আজাদ ও মোহম্মদী পত্রিকায় কবি চাকরি করতেন। মওলানা আকরম খাঁ কবিতাটি নিজের নাম দিয়ে তা প্রকাশ করলেন।
কবি এ ব্যাপারটিতে খুব অসন্তুষ্ট হলেন।
সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দিন এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘১৩৫০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে হঠাৎ একজন যুবক অতি উত্তেজিত অবস্থায় ‘সওগাত’ অফিসে এসে হাজির হন এবং জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে উদ্দেশে করে গালিবর্ষণ করতে থাকেন।
তাঁর চোখ দুটি জবাফুলের মতো লাল, মাথার ঝাঁকড়া চুল এদিক ওদিক ঝাঁকিয়ে পায়চারি করছেন আর যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছেন। ইতিপূর্বে তাকে কোনোদিন দেখিনি। তাই তার পরিচয় জানতে চাইলাম এবং উত্তেজিত অবস্থায় আমার অফিসে ঢুকে এভাবে অন্য একজনকে গালাগালি করার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। তাকে শান্ত হতে বললাম। কিন্তু তিনি থামলেন না। বললেন, বেটাকে আমি দেখে নেবো, আমি তাকে জেলে দেবো।’
ফররুখ আহমদ সম্পর্কে লেখা প্রবন্ধে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন আরেক জায়গায় লিখেছেন : ‘বিগত ২২ শে জুন (১৯৭৪) নজরুল জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সওগাত সাহিত্য মজলিসের অনুষ্ঠানে বহু কবি-সাহিত্যেকের সমাগম হয়েছিল। কিন্তু এ অনুষ্ঠানে ফররুখ আহমদকে পাইনি। একজন প্রখ্যাত কবিকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, ফররুখ আহমদ এলেন না কেন? তিনি বললেন, কবি আজকাল ঘর থেকে বড় বেশি বের হন না। তিনি নাকি ইসলামী তমদ্দুনের কবি, তাই অপরাধী। জানি না কবে পর্যন্ত তার অপরাধের সমাপ্তি হবে এবং তিনি আমাদের সাথে আবার মিলিত হবেন।’
‘অকস্মাৎ খবরের কাগজে ফররুখ আহমদের মৃত্যুর খবর বেরুল। অনাহারে, অর্ধাহারে, বিনা চিকিৎসায় তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি মৃত্যুবরণ করলেন নীরবে কিন্তু তাঁর ধারণা ও বিশ্বাসে অটল রইলেন, টললেন না নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষার তাগিদেও। ’
ফররুখ আহমদের স্ত্রী সৈয়দা তৈয়বা খাতুন স্বামী সম্পর্কে বলেন : ‘তার রোজগার খুব বেশি ছিল না, তাই আমাদের সংসারে প্রাচুর্য ছিল না কখনোই। কিন্তু সুখ ছিল অভাব-অনটনের সংসারে, প্রশান্তি ছিল।’
এ প্রসঙ্গে কবি কন্যা সাইয়েদা ইয়াসমিন বানু বলেন, ‘সোনার চামচ মুখে নিয়েই আব্বার জন্ম হয়েছিল কিন্তু দুঃসহ দারিদ্র্যের মধ্যে তাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে। দারিদ্র্য তার মাথা নত করাতে পারেনি। এই মর্দে মুমিন জীবনে আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নত করেননি। শির উঁচু রেখে সম্মানের সঙ্গে এই জরাগ্রস্ত পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।’
কবি ও প্রবন্ধকার আহমদ ছফা কবি ফররুখ আহমদের ‘অপরাধ’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘ফররুখ আহমদের অপরাধ শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়ায় যে, তিনি অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকদের মতো স্লোগান বদল করতে পারেননি। অন্যান্য সাহিত্যিক যাদের কোনো রকমের আদর্শবোধ নেই, চরিত্র নেই, সুবিধাবাদিতাই নীতি- আমরা জানি, তাঁরা আজ ফররুখ আহমদের নামে দুটি সমবেদনার কথা কইতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন। তারপরও আমরা মনে করি ফররুখ আহমদ একজন বীর চরিত্রের পুরুষ। একজন শক্তিমান কবি। আমাদের সাহিত্য থেকে তার নাম কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। দৈনিক জনকণ্ঠ/১ আষাঢ় ১৩৮০।
॥ চার ॥
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের প্রমিথিউস, তানতালাস ইডিপাস। জীবনে তিনি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করেননি। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ জীবিতকালে বেশ কিছু জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তার যোগ্যতার জন্য। মৌলিক প্রতিভার জন্য। আজকাল দেখা যায় এ জাতীয় পুরস্কারের জন্য কোনো কোনো লেখককে সরকারি বা প্রভাবশালীদের লবিং করতে হয়। তিনি এ জাতীয় কাজকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখায় যেসব পুরুষ কারের চরিত্র পাওয়া যায় কবি ছিলেন সেই পুরুষকারের প্রতীক।
॥ পাঁচ ॥
ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন আমার আদর্শিক গুরু। তবে তা পরোক্ষভাবে। কারণ তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ লাভ করার সুযোগ হয়নি। স্কুলজীবন থেকে যখন ছড়া, কবিতা লেখার চেষ্টা করি তখন এই প্রতিভাবান কবির লেখাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতাম। পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে ঢাকায় প্রকাশিত দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর শিশু-কিশোরদের আসর, যেমন-মুকুলের মহফিল, নওনেহালের আসর, শাহীন শিবির শাহীনের মহফিলে ছড়া ও কবিতা পাঠাতাম তা প্রকাশ পেত। এ সময় আমার লেখা ছোটদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ নামক একটি প্রবন্ধও প্রকাশ পায়।
১৯৭৩ সালে যখন আমি কলেজে পড়ি তখন দু-তিনটি দীর্ঘপত্র কবিকে ডাকে পাঠাই তার বাসার ঠিকানায়। পত্রে কবির প্রতি আমার যে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সে কথা লিখি। আশা ছিল দুলাইন হলেও তার উত্তর পাব। সঙ্গে এজন্য খামও দিয়েছিলাম। প্রসঙ্গত, আমার তখন মনে হয়েছিল কবি নজরুলের কাছে পত্র লিখে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ যেমন তার উত্তর পেয়েছিলেন, তেমনি আমি পাবো। যদিও ইব্রাহিম খাঁর তুলনায় আমি ছিলাম এক সামান্য বালক।
যখন পরপর চিঠিগুলোর উত্তর পেলাম না তখন অভিমান করে রইলাম। মফঃস্বল শহরে নিজের বাড়িতে থাকি। তবে বছরে দু’চারবার ঢাকায় গেলেও কবির সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। অবশ্য পরে কবির দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে মৃত্যু এবং পূর্ববর্তী তিন বছরের জীবনবোধের সম্পর্কে জানতে পেরে নিজের প্রতিই একটা অপরাধ সৃষ্টি হলো।
আজও সে আফসোস ভুলতে পারিনি। কবির মৃত্যুর দুবছর পর তার ইস্কাটনের বাসায় গিয়েছিলাম। দেখা হয়েছিল তার ছেলে আখতার সাহেবের সঙ্গে। তিনিই স্মৃতিচারণ করলেন। আমার চিঠি পড়ে কবি যেসব মন্তব্য করেছিলেন সেসব কথা বললেন। কবি ছিলেন তখন শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে খুব অসুস্থ। বলতে গেলে কলম হাতে নেয়া তখন ছেড়ে দিয়েছেন।
আখতার বললেন, আপনার কথা আব্বা বাসায় আম্মাসহ আমাদের সকলের কাছে বলেছেন। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চিঠি ও  প্রবন্ধ পড়েছেন- আমরা তা শুনেছি।
পরে কবির লেখা একটি অপ্রকাশিত কবিতা দিলেন। লেখাটি রমজানের উপরে লেখা। আমি টাঙ্গাইল থেকে রমজান ঈদের উপর একটা সংকলন বের করে ছিলাম তাতে প্রকাশ করি।
আমি কিছুটা অনুভব করলাম কবির বাসার অবস্থা দেখে। এতবড় একজন কবি তাঁর বাসায় তেমন কোন আসবাবপত্র নেই। একটা হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ার, পাশে বই রাখার টেবিল ও আলমারী এবং একটি চৌকি। আখতারের কাছে আরো জানলাম, কবির গ্রামের বাড়িতে শূন্যভিটে পড়ে আছে।
কবি কন্যা সাইয়েদা ইয়াসমিন বানু তাই লিখেছেন, ‘আব্বার ইন্তেকালের পরের ঘটনা বড়ই মর্মন্তুদ। কপর্দকহীন হয়ে আব্বা ইন্তেকাল করেছেন। বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স এবং বিষয় সম্পত্তি বলতে কিছুই রেখে যাননি। মুসাফির খালি হাতে আসে আর খালি হাতে ফিরে যায়। আব্বাও ছিলেন এমনই এক মুসাফির।’ আল্লাহ তাকে বেহেশতের উচ্চতম স্থান দান করুন। আমীন।

মন্তব্য