Gmail! | Yahoo! | Facbook

উইঘুরদের গ্রেফতারে চীনকে মিসরের সহায়তা

FacebookTwitterGoogle+Share

uighur-map-xinjiang১৯ আগস্ট ২০১৯ঃ উইঘুর শিক্ষার্থী আবদুল মালিক আবদুল আজিজকে মিসরীয় পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর হাজতে যখন তার চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়, তখন চীনা কর্মকর্তাদের তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখে অবাক হয়ে যান আবদুল আজিজ।
আবদুল আজিজকে প্রকাশ্য দিবালোকে তুলে নিয়ে যায় মিসরীয় পুলিশ। তাকে চোখ বেঁধে কায়রো থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে চীনা কর্মকর্তারা তাকে মিসরে কী করছে সে সম্পর্কে জেরা করেছিল। হাজতে উপস্থিত তিন চীনা কর্মকর্তা তার সাথে চীনের ভাষায় কথা বলেছিলেন এবং তারা আবদুল আজিজকে উইঘুর নামের বদলে চীনা নাম ধরে সম্বোধন করছিল। ২৭ বছর বয়সী আবদুল আজিজ এএফপিকে বলেন, ‘ওই কর্মকর্তারা কখনই তাদের নাম-পরিচয় বলেনি বা তারা ঠিক কারা ছিল তাও উল্লেখ করেনি। এএফপি ২০১৭ সালে মিসর থেকে আটক ৯০ জনেরও বেশি উইঘুর আটকের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সে সময় আটকদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উদঘাটনের জন্য ভাগ্যক্রমে ছাড়া পাওয়া কয়েকজন উইঘুর শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সেই ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেছে বার্তা সংস্থাটি। এএফপি বলেছে, আটকদের অধিকাংশই তুর্কি বংশোদ্ভূত সংখ্যালঘু মুসলমান। ২০১৭ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে চালানো তিন দিনের চিরুনি অভিযানের সময় গ্রেফতার হন আবদুল আজিজ। তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল আজহারের ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের একজন ছাত্র ছিলেন। গ্রেফতারের বিষয়ে ‘মিসরীয় পুলিশ সদস্যরা বলেছিলেন যে, চীন সরকার বলেছে ‘আপনারা সন্ত্রাসী’। তবে আমরা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম, আমরা কেবল আল আজহারের শিক্ষার্থী’Ñ এএফপিকে বলেন আবদুল আজিজ। এএফপি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে সেসব উইঘুরের পরিচয় রক্ষার জন্য ছদ্মনাম ব্যবহার করছে।
উইঘুরদের দমনে চীনকে সাহায্য করার পেছনে মিসরের বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, চীন মিসরের অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ। কায়রোর পূর্বে একটি নতুন প্রশাসনিক রাজধানী নির্মাণের মতো বিশাল অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোতে অর্থ ঢালছে বেইজিং। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য গত বছর রেকর্ড সর্বোচ্চ ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ওই অভিযানের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে মিসর ও চীন ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই’ শীর্ষক একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। কায়রো শহরতলির নসর সিটির থানা ২-এ কয়েক দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আবদুল আজিজকে মিসরের অন্যতম কুখ্যাত জেল তোরাতে পাঠানো হয়। ৬০ দিন আটক থাকার পর মুক্তি পেয়ে আবদুল আজিজ অক্টোবর ২০১৭ সালে উইঘুর অভিবাসন কেন্দ্রে তুরস্কে আশ্রয়ের আবেদন করে পালিয়ে যান।
‘মিসর-চীন একই কৌশল’
২০১৭ সালের ৪ জুলাই মিসরের নাসর সিটির মওসা ইবনে নাসির মসজিদের বাইরে গ্রেফতার হয়েছিল শামসুদ্দিন আহমদ (২৬)। উত্তর-পশ্চিম চীনের জিনজিয়াংয়ে তার বাবাও একই মাসে নিখোঁজ হয়েছিলেন। ‘সে জানায়, তার বাবা মারা গেছেন না জীবিত তা এখনো জানে না।’ এএফপিকে যারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তারাসহ অনেক উইঘুর জিনজিয়াংকে পূর্ব তুর্কিস্তান হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে চীন বলছে তারা সেখানে লড়ছে ‘উগ্রবাদ’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’-এর বিরুদ্ধে।
আহমদকেও তোরার কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। মিসরের অনেক হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক বন্দী রয়েছে তোরার নির্জন কারাগারে। আহমদ বলেন, ‘আমি যখন সেখানে পৌঁছে ছিলাম তখন আমি খুব ভয় পেয়েছি। আমি আশঙ্কা করছিলাম যে মিসরের পুলিশ আমাদের চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেবে।’ উইঘুরদের প্রত্যেককে তোরার জেলে ৪৫ থেকে ৫০ জন পুরুষদের দু’টি গ্রুপে বিভক্ত করা হয়েছিল এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা বড় একটি সেলে আবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। তাদের মুক্তির দুই সপ্তাহ আগে উইঘুর এবং বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক বংশের অন্য চীনা মুসলমানদের তিনটি দলে বিভক্ত করা হয়েছিল এবং রঙিন কোড দেয়া হয়েছিল। লাল, সবুজ বা হলুদÑ এই তিনটি রঙিন কোড ব্যবহার করে নির্ধারণ করা হতো তাদের নির্বাসন, মুক্তি না আরো প্রশ্ন করা হবে।
আহমদ বলেন, পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে ১১ দিনের মাথায় তিনজন চীনা কর্মকর্তা তাকে বিশেষভাবে তার বাবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। তারা জানতে চায়, আমার বাবা কোথায় এবং কিভাবে আমাকে অর্থ পাঠায়? আহমদ সবুজ দলে ছিলেন, মানে শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। নরওয়েভিত্তিক উইঘুর ভাষাতত্ত্ববিদ আবদুল ওয়ালি আইয়ুব নিশ্চিত করেছেন যে, ‘এটি একই ধরনের অনুশীলন এবং কৌশল যা চীনের অভ্যন্তরীণ ক্যাম্পে প্রয়োগ করা হয়। আমি বিশ্বাস করি না এটি একটি কাকতালীয় ঘটনা। উইঘুরদের জন্য একই তিনটি রঙের কোড ব্যবহার করে চীন।’
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য মতে, ১০ লাখেরও বেশি উইঘুরকে জোরপূর্বক গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের বন্দিশিবিরে আটকে চালানো হচ্ছে অত্যাচার এবং মগজ ধোলাইয়ের চেষ্টা। জার্মানিভিত্তিক স্বাধীন গবেষক অ্যাড্রিয়ান জেনজ বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধোয়া তুলে মানবাধিকারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার জন্য চীনের নতুন এ প্রচেষ্টাকে অনেক দেশই অনুকরণ করছে।’ মিসর-চীন নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘একটি দেশ উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা দেয়ার পরিবর্তে চীনকে উল্লেখযোগ্য অনুগ্রহের প্রত্যাশা করতেই পারে।’
মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আহমদ হাফেজ ২০১৭ সালে উইঘুরদের নির্বাসনের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘চীনা নাগরিকসহ অন্যান্য নাগরিকের মধ্যে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে সেসব ব্যক্তিকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ তবে পুলিশ উইঘুরদের যে দলটিকে ৬০ দিন আটকে রেখেছিল সে বিষয়ে তিনি এএফপির প্রশ্নের উত্তর দেননি। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ ড্যারেন বাইলার উল্লেখ করেছেন, প্রবাসী উইঘুরদের প্রত্যর্পণের জন্য থাইল্যান্ড ও অন্যান্য স্থানেও চীনা কর্মকর্তারা অনুরূপ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘মিসরে চীন কর্তৃপক্ষকে যে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল তা নজিরবিহীন।’

- এএফপি থেকে নয়া দিগন্ত

মন্তব্য