Gmail! | Yahoo! | Facbook

মুরসির মৃত্যুতে এরদোগানসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন সংস্থার বিবৃতি

FacebookTwitterGoogle+Share

morsi drঢাকা, ১৯ জুন ২০১৯ঃ মিসরের রাজধানী কায়রোর একটি আদালতে গত ১৭ জুন মামলার বিচার চলাকালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে মারা যান দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। তিনি ছিলেন মিসরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার মৃত্যুকে দেশটির সেনা সমর্থিত সরকার স্বাভাবিক বললেও বিশ্ব নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই তা মানতে নারাজ। তারা মুরসির মৃত্যুর জন্য সে দেশের ‘অভ্যুত্থানকারী’ সরকারকে দায়ী করেছেন। মুরসির মৃত্যুর ঘটনায় জাতিসঙ্ঘের তদন্ত দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা এ ঘটনায় নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছে। এ দিকে মোহাম্মদ মুরসিকে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কঠোর গোপনীয়তায় রাজধানী কায়রোতে দাফন করা হয়েছে। মুরসির পরিবারের পক্ষ থেকে সারকিয়া প্রদেশের নিজ শহরে তাকে দাফনের আবেদন জানানো হলেও তা নাকচ করে দেয় সরকার। খবর আলজাজিরা, এপি, রয়টার্স ও বিবিসির।
২০১৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুরসিকে কারাবন্দী করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় হত্যাসহ বিভিন্ন মামলা। গত ১৭ জুন সোমবার কায়রোর একটি আদালতে মামলার শুনানিকালে এজলাসে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মোহাম্মদ মুরসি। মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, ‘আদালতের এজলাসে হঠাৎ পড়ে গিয়ে’ তার মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ মে তিনি আদালতে বলেছিলেন, তার জীবন হুমকির মুখে।
সোমবার আদালতে মুরসি মারা যাওয়ার পর অনেকক্ষণ মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রাখে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল সিসির প্রশাসন। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আদালতের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর মুরসি অচেতন হয়ে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অন্য দিকে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, আদালতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি পাচার মামলার শুনানি চলছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারকের কাছে কথা বলার অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হয়। এ সময় ২০ মিনিট বক্তব্য রাখেন তিনি। বক্তব্যের মধ্যেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন মুরসি। এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। এ সময় দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুরসি।
কঠোর গোপনীয়তায় দাফন : গতকাল মঙ্গলবার কায়রোর নসর এলাকায় কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে দাফন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। মুরসির পরিবারের সদস্যদের এতে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয়। টোরা কারা-হাসপাতালে বাবাকে গোসল করিয়ে দেন ছেলে আহমেদ মুরসি। এরপর কারা-হাসপাতালেই নামাজে জানাজা শেষে কায়রোতে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাবেক নেতাদের পাশে তাকে দাফন করা হয়। সোস্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া খবরে বলা হচ্ছেÑ মুরসির ভাই, স্ত্রী, ছেলে এবং দুইজন আইনজীবী তার নামাজে জানাজায় শরিক হন। মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন মুরসির ছেলে আহমেদ মুরসি। তিনি বলেন, হাসপাতালে আমরা তাকে গোসল করিয়েছি। তার জানাজা নামাজ আদায় করেছি এবং তাকে দাফন করা হয়েছে।
মুরসির মৃত্যুর দায় মিসর সরকারের : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মুরসির মৃত্যুর জন্য সে দেশের ‘অভ্যুত্থানকারী’ সরকারকে দায়ী করেছে। মিসরের বর্তমান সরকার কারাগারে সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। সংগঠনটি মুরসির মৃত্যুতে শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বলেছে, বিশ্ববাসী মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মাদ মুরসিকে মনে রাখবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, কারাবন্দী থাকার সময়ে মুরসিকে একবারও তার আইনজীবী বা চিকিৎসকের সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি। মাত্র তিনবার তিনি স্বজনদের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
মুরসির মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছে তার সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ মুরসিকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার এবং পরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর পর মুরসির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে এবং এরই ধারাবাহিকতায় তার মৃত্যু হলো। মোহাম্মদ মুরসি ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। মুরসি কারাগারে মারা যেতে পারেন বলে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা আগে থেকেই সতর্ক করেছিল।
মুরসির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। সোমবার ইস্তাম্বুল থেকে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, জালিমের কারাগারে শহীদ হয়েছেন মুরসি। কারাগারে নিক্ষেপ করে যারা তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে সেই জালিমদের ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না। আমাদের চোখে মুরসি একজন শহীদ; যিনি তার বিশ্বাসের জন্য জীবন দিয়েছেন। ইতিহাস সেই একনায়ককে (জেনারেল সিসি) ক্ষমা করবে না, যে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে নির্যাতন করেছে এবং মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এরদোগান বলেন, মুরসিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার যাবতীয় চক্রান্ত করা হয়েছিল। আদালতে নিজের ওপর জুলুমের প্রতিবাদ করেছেন তিনি। মিসরের জনগণ ও নিজের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর মুরসির এ মৃত্যু জুলুমের সাক্ষী হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, মিসরীয়দের মুক্তির জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মুরসি যে সংগ্রাম করে গেছেন তা যুগ যুগ ধরে মুসলমানেরা স্মরণ করবেন।
নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করে কারাগারে পাঠানো এবং বিচারের নামে হাজার হাজার মুরসি সমর্থককে মিসরের জান্তা সরকার বন্দী করে রাখলেও এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে রাখায় পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করেন এরদোগান। তিনি বলেন, মোহাম্মদ মুরসি তার হাজার হাজার বিপ্লবী সমর্থককে নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। কিন্তু পাশ্চাত্যের কেউ এর প্রতিবাদ করেনি।
এরদোগান বলেন, জেনারেল সিসি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে হটিয়ে বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করে ৫০ জনকে ফাঁসি দিয়েছেন। তার দেয়া মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে পশ্চিমারা সব সময়ই নীরব থেকেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। তুরস্ককে ফাঁসির আদেশ বাতিলের জন্য তারা বারবার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা এমন সময়ে খুনি সিসির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে মিসরে সম্মেলনে অংশ নিয়েছে যখন দেশটির নাগরিকদের ফাঁসি দেয়া হচ্ছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয় ইউরোপ মানবাধিকার বিষয়ে দ্বিমুখী আচরণ করছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর এমন আচরণকে ভণ্ডামি হিসেবে আখ্যায়িত করে এরদোগান বলেন, মিসরের জালিম শাসক হয়তো গ্রেফতারকৃত নেতাদের অত্যাচার করে সাময়িক বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু তাদের ত্যাগ-তিতীক্ষার ইতিহাস মানুষের মন থেকে মুছে দিতে পারবে না।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি তার নিজের ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্টে শোক জানিয়ে লিখেছেন, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির হঠাৎ মৃত্যুর খবর পেয়ে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। তার পরিবার ও মিসরবাসীর জন্য সমবেদনা জানাই। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছে সবাইকে ফিরে যেতে হবে।
যথাযথ চিকিৎসাসেবা না দেয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ রাজনীতিক ও আইনজীবীদের একটি প্যানেল। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার ফলে মুরসির শারীরিক অবস্থা যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল তাতেই তিনি মারা গিয়েছেন। মৃত্যুর আগে তার পরিবারসহ বিভিন্ন মহল থেকেই সরকারি কর্তৃপক্ষকে মুরসির শারীরিক অবস্থা মোটেও ভালো নয় বলে জানানো হয়েছিল। এ অবহেলায় কারাগারে তার মৃত্যু হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। এসব কথার কোনো গুরুত্ব দেয়নি সরকার ও কর্তৃপক্ষ।
ড. মুরসির মৃত্যুতে চরম অবহেলার অভিযোগ করেছে ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ডিটেনশন রিভিউ প্যানেল। তারা বলছে, সাবেক এ প্রেসিডেন্টকে কারাবন্দী রাখার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

 

মন্তব্য