Gmail! | Yahoo! | Facbook

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দুরন্ত সূচনা

FacebookTwitterGoogle+Share

oval-tigersঢাকা, ৩ জুন ২০১৯ঃ অনেক প্রাপ্তির সাথে ম্যাচও জিতল বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বিশ্বমানের এক দলের বিপক্ষে শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর যা প্রয়োজন ছিল তার সবটুকুই প্রদর্শন করেছে কাল বাংলাদেশ। তা ছাড়া এটাই নতুন নয়। ২০০৭ এর বিশ্বকাপেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রথম হারিয়েছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘ দিন পর এসে তার পুনরাবৃত্তি। মাঝে দেশে (২০১৫ সনে) একটা ওয়ানডে সিরিজে ২-১ এ জেতার রেকর্ডও আছে মাশরাফিদের। এবার নিরপেক্ষ ভেনুতে ২০০৭ এর মতো আরো একবার বিধ্বস্ত করল প্রোটিয়াকে। এ জয় অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। বা অঘটনও না। যোগ্য দল হিসেবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেই তুলে নিল জয় মাশরাফিরা। বিশ্বকাপে দুরন্ত সূচনা হলো বাংলাদেশের।
আসলে ‘বাংলাদেশের প্রথম টার্গেট সেমিফাইনাল। শিরোপা তুলে আনাও অসম্ভব কিছু না।’ মাশরাফি -সাকিবরা যা বলেছিলেন, সে গুলো কি বলার জন্যই বলা কী-না, এতদিন এটা নিয়ে ছিল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব! কারণ আসলেই কি ওই পর্যায়ের দল হয়ে উঠল কি-না সেটাও তো দেখার বিষয়। বাংলাদেশ প্রমাণ করে দিলো- যা বলেছিল সেগুলো বাস্তবতার নিরিক্ষেই বলেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো একটা দলকে রীতিমতো নাজেহাল করে হারিয়ে দেয়া চাট্টিখানি নয়। পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ডের মতো দলের বিরুদ্ধে হলেও বলা যেত ‘ওদের পারফরম্যান্সের আপ-ডাউন হয়- সে জন্য‘অঘটন’। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২১ রানে হারানোর ঘটনাকে আর ‘অঘটন’ বলার অবকাশ নেই। সূচনা থেকেই ফ্রন্টফুটে থেকেই প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেয়াটা শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। সাকিব-মুশফিকদের সাবলীল খেলার কারণে এমন জয়ে স্বপ্ন জয়ের পথে শুভ সূচনা করল বাংলাদেশ। প্রাপ্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তাদের ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্কোর ৩৩০/৬ করে এ ম্যাচেই। বিশ^কাপ তো বটেই। মুশফিক-সাকিব তৃতীয় উইকেট জুটিতে ১৪২ রানের যে পার্টনারশিপ খেলেছে সেটাও রেকর্ড। তবে ব্যক্তিগত অর্জনে সাকিব পেয়েছে অনন্য এক কৃতিত্ব। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম ৫০০০ রান ও আড়াইশ উইকেট সংগ্রহে তিনিই সবাইকে ছাড়িয়ে। ওই ক্লাবে আছেন আরো চারজন (আব্দুল রাজ্জাক (পাকিস্তান) ২৫৮ ম্যাচ, শহীদ আফ্রিদী ২৫৩ ও জ্যাকুয়েস ক্যালিস ২৯৬ ও সনাৎ জয়সুরিা ৩০৪ ম্যাচ।) খেলায় ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরষ্কারটাও পেয়েছেন সাকিব। কিন্তু এ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে। কারণ ম্স্তুাফিজও অসাধারণ বোলিং করে নিয়েছে তিন তিনটি উইকেট। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৩০৯ রানে আটকে দেয়ার পেছনে মুস্তাফিজের ভূমিকা কম না। অবশ্যই সাকিব ভালো ব্যাটিং ও ১ উইকেট নেয়াও বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু মুস্তাফিজকেও পেছনে ফেলার অবকাশ নেই।
এ আসরে ব্যাটিংটা নিয়েই ছিল ক্ষানিকটা দুুশ্চিন্তা। কিন্তু সেটা দূর করল তারা এ ম্যাচে। ইংলিশ কন্ডিশন, উইকেট নিয়ে অনেক কথা! বাউন্স, সুইং, পেস বোলারদের গতিময় বল। কিন্তু ওগুলো থ্রোই কেয়ার করেছেন সাকিব-মুশফিকরা। শুধু তা-ই নয়, যা করেছেন সেটা বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে রেকর্ড। এর আগে ওয়ানডেতে সর্বাধিক রান ছিল ৩২৯ ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে, ২০১৫ তে। সেখানে কাল লন্ডনের ওভালে ৩৩০ রান করেছে তারা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। বিশ^কাপ তো বটেই, বাংলাদেশ যে কোনো লেভেলেই এমন স্কোর দলের উন্নতিটাকেই প্রকাশ করল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এর আগে সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ২৭৮/৮। সেটা টপকে এখন নিজেদের নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। বিশ^কাপেও এটা বাংলাদেশের সেরা স্কোর- এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর আগে ৩২২ রান করেছিল তারা স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গত বিশ^কাপে নেলসনে।
আসলে এ ম্যাচে টসে জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিং করতে দেয়ার যথার্থতা বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রোটিয়া ক্যাপ্টেন ফাফ ডুপ্লেসিস। ডেল স্টেইন ইনজুরিতে। ৪ ওভার বোলিং করে এনডিগিরও হ্যামস্ট্রিং। এরপর রাবাদা একেবারেই নি®প্রভ। সব মিলিয়ে প্রোটিয়া বোলিং লাইনটাকে বেশ নড়বড়েই মনে হয়েছে। যার পূর্ণ সুবিধা নিয়েই ওই স্কোর। তবে আরো কিছু রান হতেই পারত। সেটা ১০-২০টা রান। প্রত্যাশাতেও ছিল অমন। কিন্তু ততক্ষণে প্রোটিয়া বোলাররা নিজেদের গুছিয়ে ফেলেছেন। যদিও ইনিংসের একেবারে শেষ মুহূর্ত ছিল সেটা। মূলত ম্যাচটাকে টেনে নিয়ে গেছেন সিনিয়র ওই দুই ব্যাটসম্যানই। তবে ৩৩০ রানের স্কোরটা আরো ভালো দেখাত যদি একটি সেঞ্চুরি থাকত। সাকিব ও মুশফিক যেভাবে খেলছিলেন। তাতে অন্তত একজনের কাছে অমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দলের প্রয়োজনে বিগ শট নিতে গিয়ে আউট। এদিন সূচনা থেকেই প্রোটিয়া বোলারের বিপক্ষে অ্যাটাকিং ব্যাটিং করেছে বাংলাদেশ। খেলব কি, খেলব না বলে শেষ পর্যন্ত কব্জির আঘাত আটকে রাখতে পারেনি তামিমকে। খেলেছেন। সৌম্যকে নিয়ে ৬০ রানের ওপেনিং পার্টনারশিপ খেলে অন্য ব্যাটসম্যানদের মনবল বাড়িয়ে দেন। তামিম ২৯ বলে ১৬ রান করে আউট হয়ে গেলেও সৌম্য তার খেলাটাই খেলেন। ৩০ বলে ৪২ রানের এক ইনিংস খেলে আউট হন তিনিও। এরপরই সাকিব ও মুশফিকের ওই পার্টনারশিপ। সূচনাতে দেখে শুনে খেলে এগিয়ে যেতে থাকেন। ২৪ ওভারে ১৫০/১, পূর্ণ করে ফেলেন তারা। আর শতরানের পার্টনারশিপ তাদের ৯৫ বলে। দু’জনই খেলছিলেন হাতখুলেই। হাফ সেঞ্চুরির দিকেও এগোচ্ছিলেন একই সাথে। তবে প্রথম ওই লক্ষ্যে পৌঁছান সাকিব। ৫৪ বলে ওই রান করেন তিনি এক ছক্কা ৫ চারের সাহায্যে। এরপর মুশফিক ৫২ বলে ওই লক্ষ্যে পৌঁছান ৬টি চারের সাহায্যে। ইমরান তাহিরের বলে এ জুটি বিচ্ছিন্ন হয়। সাকিব সুইপ করতে গেলে বোল্ড হয়ে যান। এরপর মুশফিক এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে মোহাম্মাদ মিথুন ও মাহমুদুল্লাহকে দিয়ে অ্যাটাকিংয়ের চেষ্টা করেন। তার প্লান ছিল, সুযোগ বুঝে খেলে সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেটা হয়নি। ৭৫ করে সাকিব আউট হলেও মুশফিক আউট হন ৭৮ করে। ৮০ বলে ওই রান করেন তিনি। তবে এ দুই সেট ব্যাটসম্যান আউট হওয়াতেই ম্যাচে ফিরতে সক্ষম হয় প্রোটিয়া। নতুবা স্কোরটা সাড়ে তিন শ ছাড়িয়ে যাওয়ারই কথা। মিথুন ২১ বলে ২১ করে আউট হলেও শেষের দিকে মাহমুদুল্লাহ, মোসাদ্দেককে নিয়ে ওই লক্ষ্যে পৌঁছান। মোসাদ্দেক অবশ্য ২০ বলে দ্রুত ২৬ করে আউট হলেও মাহমুদুল্লাহ ৩৩ বলে ৪৬ করে ছিলেন অপরাজিত। ক্রিজে ফিরেন তিনি মেহেদিকে নিয়ে করেছেন ৩ বলে একটি বাউন্ডারির সাহায্যে ৫ রান। বোলিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মরিস, তাহির ও ফেলুকোয়ায়ো নেন দুটি করে উইকেট।
এরপর খেলতে নেমে কম যাচ্ছিল না প্রোটিয়া। তবে হাশিম আমলার ইনজুরির জন্য খেলতে না পারাটা বড় একটা গ্যাপের তৈরি করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার তার প্রমাণ মিলেছে। টপ অর্ডারে ডিকক ও ডুপ্লেসিসই ছিলেন নির্ভরযোগ্য। কিন্তু ডিকক ২৩ রানে রান আউট এবং ডুপ্লেসিসকে মেহেদি হাসান ৬২ রানে বোল্ড করার পরই আশা জেগে ওঠে। পরবর্তীতে মুস্তাফিজের অসাধারণ বোলিংয়ে মিডল অর্ডারে ডুমিনি, ডাসেন, ডেভিড মিলারের মতো তিনজন ক্রিকেটারকে আউট করলে জয়ের বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবু প্রোটিয়া ডেঞ্জার। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত না জানি কিছু করে ফেলে কি-না এ দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু দিনটাও যে ছিল বাংলাদেশের। থামিয়ে দেন তাদের ৩০৯/৮ রানে। কিছু ভুলত্রুটি ফিল্ডিংয়ে ছিল। সেটা প্রতিপক্ষেরও। কিন্তু তা বাঁধা হয়নি প্রেস্টিজিয়াস এ জয়ে। তাছাড়া ডুপ্লেসিসদের সামনেও ছিল রেকর্ড। এত রান তাড়া করে বিশ^কপে যে একবারও জিতেনি এখনো প্রোটিয়া।

মন্তব্য